আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কম্পিউটার। আজকের পাঠে আমরা কম্পিউটারের সংজ্ঞা ও প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ পড়বো এবং সেই আলোকে কুইজে অংশগ্রহণ করবো। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে পৃথিবীতে মানব সভ্যতার যে বিশাল পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তার পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে কম্পিউটার। আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে কম্পিউটার এবং এর সাথে সম্পর্কযুক্ত অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির অবদান সবচেয়ে বেশি।
একসময় যে কম্পিউটার বসানোর জন্য একটি পুরো ভবনের প্রয়োজন হতো, এখন তার চাইতেও শক্তিশালী কম্পিউটার ব্যবহার করে তৈরি একটি ট্যাবলেট পিসি বা মোবাইল ফোন আমরা পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াই। কম্পিউটারের প্রধান অংশ হলো সিস্টেম ইউনিট বা সিপিইউ। সিপিইউয়ের মধ্যেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ রয়েছে; যেমন- মাদারবোর্ড, প্রসেসর, হার্ডডিস্ক, র্যাম ইত্যাদি। এ অধ্যায়ে আমরা কম্পিউটারের প্রজন্মকাল ও শ্রেণিবিভাগ সম্পর্কে জানতে পারবো।
ল্যাটিন শব্দ কম্পুটেয়ার থেকে ইংরেজি কম্পিউটার (Computer) শব্দের উদ্ভব, যার অর্থ গণনাকারী যন্ত্র (Calculating machine)। কম্পিউটার দিয়ে নির্ভুলভাবে গাণিতিক হিসাব যেমন যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ করা যায় এবং যুক্তি ও সিদ্ধান্তমূলক কাজও করা যায়। কম্পিউটার একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা যন্ত্র, যা পূর্বে লিখিত নির্দেশনা অনুসারে উপাত্ত (Data) সংরক্ষণ করতে পারে, প্রক্রিয়াজাত করতে পারে এবং তথ্য (Information) প্রদর্শন করতে পারে।
কম্পিউটারের নিজে নিজে কাজ করার কোনো ক্ষমতা নেই। কম্পিউটারের আবিষ্কারকগণ ও ব্যবহারকারীগণই যন্ত্রটিকে বলে দেন তাকে কী করতে হবে এবং কীভাবে করতে হবে। মূলত উপযুক্ত নির্দেশনার প্রভাবে কম্পিউটার জড় পদার্থ থেকে গাণিতিক শক্তিসম্পন্ন এক বুদ্ধিমান যন্ত্রে পরিণত হয়। বিশ শতকের ক্রান্তিলগ্নে প্রযুক্তিগত দিক থেকে অন্যান্য শাখার তুলনায় কম্পিউটারের উন্নতি ও প্রসার ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আধুনিক সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ কম্পিউটার বর্তমানে শক্তিশালী এবং বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। সময়ের সাথে সাথে এই যন্ত্রটি ধাপে ধাপে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। কম্পিউটারের ইতিহাস ও প্রজন্ম অনুযায়ী বর্তমানে পঞ্চম প্রজন্মের কম্পিউটার যুগ চলছে। সকল প্রজন্মের কম্পিউটারে একই বৈশিষ্ট্য ছিল না। ধাপে ধাপে এগুলো উন্নত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও সমৃদ্ধ হবে। এখানে আমরা আধুনিক কম্পিউটারের প্রধান ১০টি বৈশিষ্ট্য (10 Characteristics of modern computers in Bangla) সম্পর্কে জানবো, যা কম্পিউটারকে একটি সাধারণ ক্যালকুলেটর থেকে সুপার কম্পিউটারে পরিণত করেছে।

কম্পিউটারের দ্রুতগতি, নির্ভুলতা, বিশ্বাসযোগ্যতা, সূক্ষ্মতা, ক্লান্তিহীনতা, স্মৃতি বা মেমরি, যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত, বহুমুখিতা, অসীম জীবনীশক্তি ইত্যাদি হলো কম্পিউটারের প্রধান বৈশিষ্ট্য। নিম্নে বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা করা হলো-
কম্পিউটার অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে কাজ করে। এত দ্রুতগতির কারণ হলো এটা কাজ করে বৈদ্যুতিক সিগন্যালের মাধ্যমে, যা চলাচল করে প্রায় আলোর গতিতে। কম্পিউটারের এ দ্রুতগতিসম্পন্ন গণনার কাজকে মিলিসেকেন্ড, ন্যানোসেকেন্ড, পিকোসেকেন্ড ইত্যাদি সময়ের একক হিসেবে ভাগ করা হয়। 1 মিলিসেকেন্ড = 103 সেকেন্ড 1 মাইক্রোসেকেন্ড = 10 সেকেন্ড ন্যানোসেকেন্ড = 109 সেকেন্ড 1 পিকোসেকেন্ড = 10-12 সেকেন্ড উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, সাধারণত একটি যোগ করতে কম্পিউটারের সময় লাগে 50 ন্যানোসেকেন্ড। কম্পিউটার এক সেকেন্ডে এ রকম দুই কোটি যোগ করতে পারবে । একজন সাধারণ মানুষের 100 বছরের কাজ একটি সাধারণ কম্পিউটার 1 ঘণ্টায় করতে সক্ষম।
কম্পিউটার একটি মেশিন। মানুষের দেওয়া সূত্র ও যুক্তির মাধ্যমে কম্পিউটার ফলাফল প্রদান করে । মানুষ তার নিজের আবিষ্কার করা সূত্র ব্যবহার করতে গিয়ে ভুল করতে পারে। কিন্তু কম্পিউটার কখনও ভুল করে না। কম্পিউটারের নির্ভুলতা শতকরা ১০০ ভাগ।
কম্পিউটারের স্মৃতিশক্তি অনেক বেশি, তাই অনেক ঘর পর্যন্ত নির্ভুলভাবে গাণিতিক ক্রিয়াকলাপ করতে পারে । এ কারণে কম্পিউটারের সূক্ষ্মতা তা অনেক বেশি ধরে নেওয়া যায় ৷
কম্পিউটার এত দ্রুতগতিতে কাজ করলেও তার কাজ নির্ভুল। উন্নত প্রযুক্তির কারণে কম্পিউটারে সব সময় নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম দিয়ে নির্দিষ্ট কাজ পুরোপুরি নির্ভুলভাবে করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে প্রোগ্রাম ও ডাটা অবশ্যই ১০০% শুদ্ধ হতে হবে। আধুনিক কম্পিউটার প্রমাণ করছে যে, মানুষ ভুল করে, কিন্তু কম্পিউটার ভুল করে না ৷
কম্পিউটার একটি যন্ত্র। আর যন্ত্রের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ক্লান্তিহীনতা। পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে বা সাধারণ কোনো নিয়মিত কাজে কম্পিউটার রাতদিন ক্লান্তিহীন এবং বিশ্রামহীনভাবে কাজ করতে পারে। কম্পিউটারের কোনো আবেগ নেই। তাই কাজ করতে তার মনোযোগ, সহিষ্ণুতা বা উৎসাহে ভাটা পড়ে না।
কম্পিউটারের নিজস্ব স্মৃতিশক্তি আছে। একে ইংরেজিতে মেমরি (Memory) বলে। প্রোগ্রামারগণ কম্পিউটার কী করে কাজ করবে, তার নির্দেশ কম্পিউটারের স্মৃতিতে সংরক্ষণ করে দেন। কাজ করার সময় এখান থেকে – ধারাবাহিকভাবে নির্দেশ তুলে নিয়ে কম্পিউটার কাজ করে। কম্পিউটারের স্মৃতিতে প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রোগ্রাম সংরক্ষণ করা যায় এবং অপ্রয়োজনীয় তথ্য স্মৃতি থেকে মুছে ফেলা যায়।
কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে। এটি কম্পিউটারে একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এ কারণে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মানুষের পরিবর্তে কম্পিউটারকে ব্যবহার করা হয়।
কম্পিউটারকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবস্থা বিচার করে কী কাজ করতে হবে তার আগাম নির্দেশ দিয়ে রাখলে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন কাজ এটি নিজে নিজে করতে পারে। তবে নিজে থেকে কম্পিউটার কোনো মৌলিক চিন্তাশক্তির অধিকারী নয়। মানুষের দেওয়া উন্নত সফ্টওয়্যার ব্যবহার করে কম্পিউটার যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে।
বহুমুখী কাজে কম্পিউটারকে ব্যবহার করা যায়। এর কারণ হচ্ছে কম্পিউটার একটি প্রোগ্রাম-নির্ভর যন্ত্র । যখন যে প্রোগ্রাম কম্পিউটারে লোড করা থাকে, সে প্রোগ্রাম অনুসরণ করে কম্পিউটার কাজ করতে পারে। এ কারণে একটি কম্পিউটারে যেমন হিসাবনিকাশের প্রোগ্রাম ব্যবহার করে হিসাবনিকাশ করা যায় আবার মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার ব্যবহার করে ছবি দেখা যায় বা গান শোনা যায় ।
দীর্ঘদিন কাজ করার পরেও প্রোগ্রামের মানের কোনো ক্ষতি হয় না। একটি প্রোগ্রাম তৈরি করে তাকে হাজার হাজার কপি করে হাজার হাজার লোক ব্যবহার করলেও মানের কোনো ক্ষতি হয় না। হার্ডওয়্যারের একটি নির্দিষ্ট জীবনসীমা আছে, কিন্তু সফ্টওয়্যারের জীবন অসীম।
এ পাঠে আমরা শিক্ষক নিবন্ধন প্রস্তুতি: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (কম্পিউটার বিজ্ঞান) কোর্সের কম্পিউটারের সংজ্ঞা ও প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ সম্পর্কে জানলাম। যদিও আধুনিক কম্পিউটারের বৈশিষ্ট্য অনেক উন্নত, কিন্তু প্রাচীন প্রজন্মের কম্পিউটারে এসব বৈশিষ্ট্য ছিল না। পরবর্তী পাঠে আমরা কম্পিউটারের প্রজন্মভিত্তিক বৈশিষ্ট্য ও উন্নয়নের ধাপ সম্পর্কে জানবো।