উচ্চগতিতে দুইটি বস্তুর মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে কী ঘটবে? বস্তু দুইটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, অর্থাৎ তুলনামূলক ক্ষুদ্র অংশে ভাগ হয়ে যাবে। এমন সংঘর্ষকে সাধারণ চোখে বিশেষ কিছু মনে না হলেও, এর মাধ্যমে বিগ ব্যাংয়ের পরমুহূর্তের পরিস্থিতি কেমন ছিল, তা জানা যায়। তাছাড়া খালি চোখে অদৃশ্য, অর্থাৎ এলিমেন্টারি পার্টিকল সম্পর্কে জানা যায়।
যার ফলে এখন পর্যন্ত মানব ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মেশিন তৈরি করা হয়েছে, just দুটি বস্তুর সংঘর্ষ ঘটানোর জন্য—যা এলএইচসি বা লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার নামে পরিচিত। দুইটি বড় বস্তুর মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটানো খুবই সহজ। কিন্তু বস্তু দুইটি যদি ছোট হয়, যেমন দুইটি চালের সংঘর্ষ, তবে সেটা সহজ হবে না। আবার চালের বিপরীতে যদি দুইটি অ্যাটমের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটানোর চেষ্টা করা হয়, তবে সেটা তো আরও কঠিন হবে।
এমন কঠিন কাজই সম্ভব হয়েছে এলএইচসির মাধ্যমে। এলএইচসি তৈরি করতে গিয়ে ডাব্লিউ ডাব্লিউ ডাব্লিউ বা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়াও এলএইচসির মাধ্যমে হিগস বোসন আবিষ্কৃত হয়েছে। অবশ্য এলএইচসি তৈরি করার সময় একটি আশঙ্কার কথা চারদিকে রটে গিয়েছিল, এবং তা হচ্ছে এলএইচসি থেকে ব্ল্যাক হোল তৈরি হবে, যা পৃথিবীকে গ্রাস করে নেবে।
এলএইচসি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আজকের ভিডিও। আমি জুম্মান, আছি আপনাদের সাথে। আপনারা দেখছেন বিজ্ঞান পাইছি। লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের শুরু মূলত ১৯৭৬ সালে, ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ বা সংক্ষেপে সার্ন। লার্জ ইলেকট্রন-পজিট্রন কোলাইডার বা এলইপি তৈরির পরিকল্পনা শুরু করে।
পরিকল্পনার সাত বছর পর, ১৯৮৩ সালে এলইপির নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯৯৯ সালে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। এলইপি ছিল ইলেকট্রন এবং পজিট্রন কোলাইডার। অর্থাৎ এতে ইলেকট্রন এবং এর অ্যান্টি-পার্টিকল, পজিট্রনের সংঘর্ষ ঘটানো হতো।
এলইপি তৈরির মধ্যেই, ১৯৮৩ সালে সার্নের ইউএ-ওয়ান এক্সপেরিমেন্টের মাধ্যমে ডব্লিউ এবং জেড বোসন আবিষ্কৃত হয়েছিল। এবং এর পরের বছরেই কারলো রুবিয়াকে ইউএ-ওয়ান এক্সপেরিমেন্টের লিডার হিসেবে নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়। কারলো রুবিয়ার সাথে সাইমন ভ্যান ডার মেয়ারকেও নোবেল প্রাইজ দেওয়া হয়। যদিও তিনি নতুন কোনো পার্টিকল আবিষ্কার করেননি, মেয়ারকে নোবেল দেওয়া হয় মূলত স্টোকাস্টিক কুলিং টেকনোলজি আবিষ্কারের জন্য।
খালি চোখে অদৃশ্য পার্টিকেলের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটানোর জন্য স্টোকাস্টিক কুলিং টেকনোলজি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যাইহোক, ডব্লিউ এবং জেড বোসন আবিষ্কারের পর, পদার্থবিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ছিল হিগস বোসন এবং টপ কুয়ার্ক ডিটেক্ট করা।
থিওরেটিকালি সকল পার্টিকল থাকার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকলেও, তখন পর্যন্ত এদের ডিটেক্ট করা সম্ভব হয়নি। ফলে, এই সকল পার্টিকলসহ নতুন পার্টিকল ডিটেক্ট করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয় এলইপি। ইলেকট্রন এবং পজিট্রনের সংঘর্ষের মাধ্যমে প্রচুর ডব্লিউ এবং জেড বোসন পাওয়া যাচ্ছিল, কিন্তু টপ কুয়ার্ক কিংবা হিগস বোসন পাওয়া যাচ্ছিল না।
এর মধ্যে, ১৯৯৫ সালে ফার্মিল্যাব টপ কুয়ার্ক আবিষ্কার করে ফেলে। যার ফলে এলইপির প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় হিগস বোসন আবিষ্কার করা। কিন্তু থিওরি এবং ম্যাথমেটিক্স যতটা এনার্জিতে হিগস বোসন আবিষ্কার হবে নির্দেশ করছিল, এলইপি ততটা শক্তিশালী ছিল না।
এর ফলে, ১৯৯৮ সালে আরও শক্তিশালী পার্টিকল কোলাইডার অর্থাৎ এলএইচসি তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়। এলইপির ২৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বৃত্তাকার টানেলে স্থাপন করা হয় এলএইচসি। এই টানেল দুইটি দেশ জুড়ে বিস্তৃত—ফ্রান্স এবং সুইজারল্যান্ড। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে গড়ে ১০০ মিটার বা ৩০ তলা বিল্ডিংয়ের সমান গভীরতায় এই টানেলের অবস্থান।
এলএইচসিতে বিভিন্ন ধরনের মোট ৯৩০০টি ম্যাগনেট ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন ১২৩২টি ডিপল ম্যাগনেট, ৩৯২টি কুয়াড্রুপল ম্যাগনেট, সুপারকন্ডাক্টিং কারেকশন ম্যাগনেট ইত্যাদি। এই ম্যাগনেটগুলো মূলত প্রোটনের গতিপথ ঠিক রাখে এবং পরবর্তীতে প্রোটনকে একটি বৃত্তাকার পথে পরিচালিত করে, যেন প্রোটন-প্রোটন মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটানো যায়।
এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে—এই কাজের জন্য সাড়ে ৩০ লাখ কেজি ওজনের ৯৩০০টি ম্যাগনেটের প্রয়োজন কেন পড়লো?
দুইটি বুলেটকে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটানো সহজ কাজ। অন্যদিকে এলএসসিতে দুইটি প্রটনের মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটানো হয়।
এখন এই বিষয়টি কতটা কঠিন তা বোঝার জন্য প্রটোন আসলে কতটা ছোট তা আগে বোঝার প্রয়োজন। আমরা একটি চুলের ব্যাসকে যদি পৃথিবীর ব্যাসের সমান বিবেচনা করি, তবে প্রটন হবে একটি চিনির দানার সমান।
তাহলে বুঝতেই পারছেন প্রটন আসলে কতটা ক্ষুদ্র। এখন এমন ক্ষুদ্র প্রটনকে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটানোর জন্য প্রটনকে অতি সূক্ষ্ম স্থানে আনা প্রয়োজন, যা করা হয় ম্যাগনেটের মাধ্যমে।
তাছাড়া প্রটনকে শূন্যস্থানে ভাসিয়ে রাখতে হয় এবং এটিও করা হয় ম্যাগনেটের মাধ্যমে। তার উপর প্রটনকে ফোকাস করে খুবই ক্ষুদ্রস্থানে আনতে হয়, এই কাজের জন্য ম্যাগনেটের প্রয়োজন।
এবং এইজন্যই এলএসসিতে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বিশাল বিশাল ম্যাগনেট ব্যবহার করা হয়েছে। এখন এলএসসি overall কিভাবে কাজ করে সে বিষয়টি বলা যাক।
হাইড্রোজেন গ্যাসের মাধ্যমে ইলেকট্রিক কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথমে হাইড্রোজেন অ্যাটম থেকে ইলেকট্রন সরিয়ে ফেলা হয়, ফলে সেটি প্রটনে পরিণত হয়। এখন প্রটন হচ্ছে পজিটিভ চার্জবিশিষ্ট, যার ফলে ইলেকট্রিক ফিল্ডের মাধ্যমে প্রটনকে গতিশীল করা সম্ভব।
প্রথমে ইলেকট্রিক পালসের মাধ্যমে প্রটনের মধ্যে আলোর বেগের তিন ভাগের এক ভাগ গতি নিয়ে আসা হয়। এরপর প্রটনকে পাঠানো হয় বুস্টারে। বুস্টার মূলত ১৫৭ মিটার পরিধির গোলাকার কাঠামো, যেখানে চারটি গোলাকার টানেল রয়েছে।
বুস্টারের নির্দিষ্ট পালসে ইলেকট্রিক ফিল্ড অ্যাপ্লাই করে প্রটনের গতি বাড়ানো হয়। অন্যদিকে ম্যাগনেটিক ফিল্ডের মাধ্যমে প্রটনের গতিপথ ঠিক রাখা হয়, অর্থাৎ প্রটন যেন টানেলের গায়ে না লেগে গোলাকার পথে থাকে।
এই বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় ম্যাগনেটের মাধ্যমে। বুস্টারে প্রটনের গতি দাঁড়ায় আলোর বেগের ৯১.৬ শতাংশ। ফলে প্রটনগুলো দৈর্ঘ্য সংকোচনের কারণে স্বল্প স্থানে স্কুইজ হয়ে যায়, যাকে বলা হয় প্রটন বিন।
এরপরে প্রটন বিনকে প্রটন সিনক্রোট্রনে পাঠানো হয়। এটি ৬২৮ মিটার পরিধির গোলাকার টানেল। এখানে প্রটন আলোর গতির ৯৯.৯ শতাংশ গতি অর্জন করে, অর্থাৎ প্রটন তার সর্বোচ্চ গতি অর্জন করে।
এরপরেও ইলেকট্রিক ফিল্ডের মাধ্যমে প্রটনে এনার্জি দেওয়া হয়। এতে প্রটনের গতি বাড়তে না পারলেও অতিরিক্ত এনার্জি ধারণ করে, অর্থাৎ প্রটনের ভর বাড়তে থাকে। এখানে প্রটন তার রেস্ট ম্যাসের তুলনায় ২৫ গুণ বেশি ভারী হয়ে থাকে।
এবং প্রটনের এনার্জি দাঁড়ায় ২৫ গিগা ইলেকট্রন ভোল্ট। এখান থেকে প্রটনকে ৭ কিলোমিটার পরিধির টানেলে পাঠানো হয় এবং সেখানেও ইলেকট্রিক ফিল্ডের মাধ্যমে প্রটনের এনার্জি বৃদ্ধি করা হয়।
এখানে এসে প্রটনের এনার্জি ২৫ গিগা ইলেকট্রন ভোল্ট থেকে দাঁড়ায় ৪৫০ গিগা ইলেকট্রন ভোল্ট। এরপর প্রটনকে মূল টানেলে পাঠানো হয়, অর্থাৎ ২৭ কিলোমিটার পরিধির টানেলে। এই ২৭ কিলোমিটার টানেলে দুইটি টিউব থাকে, যাদের ব্যাস মোটামুটি একটি টেনিস বলের সমান।
দুইটি টিউবে বিপরীত দিকে ছুটতে থাকা প্রটন থাকে। অর্থাৎ একটি টানেলে প্রটন ক্লকওয়াইজ এবং অন্যটিতে অ্যান্টিক্লকওয়াইজ। এই টিউবগুলো প্রায় ভ্যাকুয়াম অবস্থায় থাকে, যেন প্রটনের সাথে কোনো প্রকার বায়ুর সংঘর্ষ না ঘটে।
এ পর্যায়ে এসেও ইলেকট্রিক পালসের মাধ্যমে প্রটনের এনার্জি ক্রমাগত বৃদ্ধি করা হয়। এবং এই শক্তি সর্বোচ্চ ৭ টেরা ইলেকট্রন ভোল্ট পর্যন্ত করা যায়। তখন প্রটনের ভর তার রেস্ট ম্যাসের তুলনায় ৭০০০ গুণ বেশি হয়ে থাকে।
এখনই উচ্চশক্তির প্রটন টানেলের গায়ে না লেগে সঠিক পথে মুভ করার ক্ষেত্রে ম্যাগনেট ব্যবহার করা হয়। এখনই ম্যাগনেটগুলোকে কিন্তু আবার প্রায় পরম শূন্য তাপমাত্রায় রাখতে হয়, যেন ম্যাগনেটগুলো সুপারকন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করে।
অন্যথায় এত বিশাল ইলেকট্রোম্যাগনেট এতটাই গরম হয়ে যাবে যে এই গরমে যাবতীয় যন্ত্রাংশ গলে যাবে। এখন ম্যাগনেটকে -২৭১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখার জন্য ব্যবহার করা হয় লিকুইড হেলিয়াম, যার পরিমাণ প্রায় ১২০ মেট্রিক টন।
এছাড়াও এই মেশিনের সকল কিছুকে সংযুক্ত রাখতে প্রায় ২.৫ লক্ষ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কেবল ব্যবহার করা হয়েছে, যা দ্বারা পৃথিবীর বিষুবরেখা অঞ্চলকে ছয়বার প্যাঁচানো সম্ভব।
এলএসসি যখন চালু করা হয়, তখন এতে প্রতি ঘণ্টায় ২০০ মেগাওয়াট ইলেকট্রিসিটি খরচ হয়, যা খুবই বিশাল। যেমন সম্পূর্ণ নরসিংদী জেলায় প্রতিদিনের ইলেকট্রিসিটির চাহিদা হচ্ছে ১০৫ মেগাওয়াট। সেখানে এলএসসির প্রতি ঘণ্টায় প্রয়োজন ২০০ মেগাওয়াট।
তাহলে বুঝতেই পারছেন এলএসসি কতটা ইলেকট্রিসিটি ব্যবহার করে। যাইহোক, উচ্চগতি এবং শক্তির প্রটন বিশাল ২৭ কিলোমিটার টানেলে এসে প্রস্তুত সংঘর্ষে লিপ্ত হবার জন্য। এ ক্ষেত্রে এলএসসিতে চারটি বড় ডিটেক্টর রয়েছে, যেখানে প্রটন-প্রটন সংঘর্ষ ঘটানো হয়।
এই চারটি ডিটেক্টরের মধ্যে দুইটি জেনারেল পারপাসে ব্যবহার করা হয় এবং বাকি দুইটি স্পেশাল পারপাসে ব্যবহার করা হয়। জেনারেল পারপাসে ব্যবহার করা ডিটেক্টর দুইটির নাম হচ্ছে এটলাস এবং সিএমএস। ডিটেক্টরগুলোর সাইজ খুবই বিশাল। এটলাস লম্বায় দেড়শো ফিট বা ১৫ তলা বিল্ডিংয়ের সমান এবং প্রস্থে ৮২ ফিট এবং ওজন ৭০০০ টন বা ৭০০০০০০ কেজি।
এটলাসের তুলনায় মানুষের সাইজ হবে অতি ক্ষুদ্র। এই বিশাল ডিটেক্টরের মাঝখানে চুলের মতো সূক্ষ্ম স্থানে বিপরীত দিকে ছুটে চলা প্রোটনকে মুখোমুখি করা হয় যেন এদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটতে পারে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে প্রোটন-প্রোটন সংঘর্ষ ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম, যা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
এখন প্রোটনের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটার সম্ভাবনা এত কম কেন? এই বিষয়টি আগেই বলা হয়েছে—চুলের ব্যাস যদি পৃথিবীর ব্যাসের সমান বিবেচনা করা হয়, তবে প্রোটনের সাইজ হবে চিনির দানার সমান। এখন পৃথিবীতে দুটি চিনির দানাকে বিপরীত দিক থেকে নিক্ষেপ করে সংঘর্ষ ঘটানোর সম্ভাবনা যতটুকু, ডিটেক্টরে প্রোটন-প্রোটন সংঘর্ষের সম্ভাবনা ততটুকুই।
তবে একটি চিনির দানার বিপরীতে যদি উভয় দিক থেকে ১ কেজি চিনি নিক্ষেপ করা হয় তবে কিন্তু কিছু মুখোমুখি সংঘর্ষ পাওয়া যাবে। এলএসসিতে ঠিক এই কাজটিই করা হয়। একসাথে অনেকগুলো প্রোটনকে রাখা হয়, যাকে বলা হয় প্রোটন বিম। একটি বিমে প্রায় একশো মিলিয়ন প্রোটন থাকে।
আরেকটু স্পেসিফিক করে বললে, ১.৭২ × ১০¹¹ প্রোটন। এখন বাম দিক থেকে ১০০ মিলিয়ন প্রোটন এবং ডান দিক থেকে ১০০ মিলিয়ন প্রোটন যদি আসে তবে এদের মধ্যে কিছু সংঘর্ষ অবশ্যই ঘটবে। এক্ষেত্রে দেখা যায় গড়ে ৫০ থেকে ৭টি প্রোটন-প্রোটন সংঘর্ষ পাওয়া যায়। ঠিকই শুনেছেন—একশো মিলিয়ন থেকে মাত্র সাতটি সংঘর্ষ।
সংখ্যাটি খুবই কম এবং অপর্যাপ্ত। এই সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে প্রতি সেকেন্ডে ৪০ মিলিয়ন প্রোটন বিম ক্রস করানো হয়, যা থেকে সেকেন্ডে কয়েক কোটি সংঘর্ষ পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংঘর্ষ থেকে মানুষের প্রাপ্তি কী?
এলিমেন্টারি পার্টিকল এমন একটি বিষয় যা সরাসরি চোখে দেখা সম্ভব নয়, তবে এদের আচরণ এবং প্রপার্টি জানা সম্ভব। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত এলিমেন্টারি পার্টিকল হচ্ছে এগুলো, যা আমাদের মহাবিশ্বের সবকিছুর বিল্ডিং ব্লক। থিয়োরি অনুযায়ী এর বাইরে আরও এলিমেন্টারি পার্টিকল থাকতে পারে।
এখন আসলেই এর বাইরে আরও এলিমেন্টারি পার্টিকল রয়েছে কিনা তা জানার পদ্ধতি হচ্ছে দুইটি বস্তুর মুখোমুখি সংঘর্ষ। দৃশ্যমান বস্তুর সংঘর্ষে যেমন সেটি ছোট ছোট অংশে ভেঙে যায়, ঠিক একইভাবে প্রোটন-প্রোটন সংঘর্ষে প্রোটন আরও ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে যায়।
এখন প্রোটন ভেঙে গেলে কী পাওয়া যাবে? নিশ্চয়ই আপ এবং ডাউন কোয়ার্ক পাওয়া যাবে। কিন্তু এলএসসির ক্ষেত্রে খেয়াল করুন, প্রোটনের ভর তার রেস্ট ম্যাসের চেয়ে অনেক বেশি থাকে, অর্থাৎ এনার্জি বেশি থাকে।
এখন এই অতিরিক্ত এনার্জির প্রোটন যখন ভেঙে যায় তখন তা থেকে আমাদের জানার বাইরেও যদি অন্য এলিমেন্টারি পার্টিকল থাকে তা তৈরি হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। কারণ, এই কোলাইডেন্সিস থিওরি অনুযায়ী ম্যাস এবং এনার্জি পরস্পর সম্পৃক্ত।
উচ্চ গতি এবং শক্তির প্রোটনের সংঘর্ষের ফলে প্রচুর পরিমাণ এনার্জি নির্গত হয় এবং এই এনার্জি কিছুক্ষেত্রে ফিজিক্যাল ম্যাসে রূপ নেয়। এনার্জি যত বেশি হবে, ততই আননোন পার্টিকল তৈরি হবার সম্ভাবনা দেখা দেয়।
তবে এখানে একটি বিষয় হচ্ছে, আননোন পার্টিকল তৈরি হলেও তা খুবই দ্রুত ডিকে হয়ে অন্য পার্টিকেলের রূপ নেয়, অর্থাৎ আমাদের পরিচিত পার্টিকেল যেমন কোয়ার্ক, ফোটন ইত্যাদির রূপ নেয় এবং এটা খুবই অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে।
এখন আননোন পার্টিকল তৈরি হয়েছে কিনা তা জানার জন্য এটলাসের মতো বিশাল সেনসিটিভ ডিটেক্টর প্রয়োজন। সংঘর্ষের পর ডিটেক্টরের কোন স্থানে কোন পার্টিকল হিট করল তা পরিমাপ করে এর পেছনে গিয়ে এর আগের পার্টিকল কেমন ছিল, অর্থাৎ প্রপার্টি কেমন ছিল তা ক্যালকুলেট করা হয়।
এবং এরপর এর পরবর্তী ধাপ। এখানে মূলত কমপ্লেক্স ম্যাথমেটিক্স ব্যবহার করা হয়, যার মাধ্যমে আননোন কোনো পার্টিকল তৈরি হয়েছিল কিনা তা জানা যায়। যেমন ২০১২ সালের জুলাইয়ে সার্ন এলএসসির মাধ্যমে হিগস বোসন ডিটেক্ট করার কথা জানায় এবং তা ছিল গ্রাউন্ড ব্রেকিং। হিগস বোসনকে গড পার্টিকলও বলা হয়ে থাকে।
এই বিষয়ে অবশ্য আমার একটি পূর্ণাঙ্গ ভিডিও রয়েছে। লিংক ডেসক্রিপশন বক্সে দেয়া থাকবে। এই রোড গেলার সংঘর্ষের মাধ্যমে নতুন পার্টিকল সম্পর্কে জানার বিষয় বা ডিটেলস করার বিষয়, যা আপনার আমার ব্যক্তিজীবনে কোনো কাজে না আসলেও ব্যক্তিজীবনের ব্যবহৃত টেকনোলজির জন্য প্রয়োজন।
নিউটন যখন গ্র্যাভিটি ব্যাখ্যা করেছেন, তখন হয়তো ভাবেননি এর তিনশো বছর পরেই এই সূত্র ব্যবহার করে মানুষ চাঁদে যাবে। ঠিক একই বিষয় এলিমিনেটরি পার্টিকেলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বর্তমানের আবিষ্কার ভবিষ্যতের টেকনোলজির জন্য কাজে আসবে।
সিএমএস ডিটেক্টরের সাইজ এটলিস্ট থেকে কিছুটা ছোট, তবে ওজনে বেশি। এটি ৬৮ ফিট লম্বা এবং প্রস্থে ৮২ ফিট, কিন্তু এটির ওজন আবার ১২,০০০ টন। এটলিস্টের অবস্থান সুইজারল্যান্ডে, অন্যদিকে সিএমএস এর অবস্থান ফ্রান্সে।
এটলিস্ট এবং সিএমএস কোলাইডার হচ্ছে জানালার পারপাস, অর্থাৎ এগুলো সংঘর্ষের সবকিছু লক্ষ্য করে। অন্যদিকে স্পেশাল ডিটেক্টর স্পেসিফিক কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এলএসসিতে দুইটি স্পেশাল ডিটেক্টর রয়েছে, একটি হচ্ছে এলিস এবং অন্যটি হচ্ছে এলিসিডি।
এলিসে প্রটনের সংঘর্ষের পরিবর্তে লেডিয়নের সংঘর্ষ ঘটানো হয়, অর্থাৎ প্রটনের তুলনায় বিশাল বড় লেড নিকেলে সংঘর্ষ ঘটানো হয়ে থাকে। বছরের ১২ মাসের মধ্যে কয়েক মাস প্রটন সংঘর্ষ অফ রেখে লেডিয়ন নিয়ে কাজ করা হয়ে থাকে। লেড নিউ প্লেয়ার ভর বেশি হওয়ায় এদের সংঘর্ষের ফলে অসংখ্য এলিমেন্টারি পার্টিকেলের একটি ক্লাউড তৈরি হয়, যা থেকে স্পেসিফিক কোনো পার্টিকেল সম্পর্কে জানা সম্ভব।
আসলে এই ক্ষেত্রে প্রচন্ড উত্তপ্ত ওয়ার্ড ক্লোন প্লাজমা তৈরি হয়, যা মূলত প্রাথমিক মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে, তার মানে এলিসে বিগ ব্যাং এর পরমহূর্তের অবস্থা তৈরি হয়, যার মাধ্যমে বিগ ব্যাং এর পর কিভাবে ফিজিক্স কাজ করেছিল তা স্টাডি করা যায়।
এলিসি বিয়ের মাধ্যমে সিপি বায়োলেশন স্টাডি করা হয়ে থাকে। এই সিপি বায়োলেশন আবিষ্কার করেন জ্যাম স্কার্নিম এবং ভেলফিট, ১৯৬৪ সালে এবং ১৯৮০ সালে তারা এই আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পান। সিপি বায়োলেশন বিস্তারিত বলতে গেলে ভিডিও জটিল হয়ে যাবে, তবে এটুকু বলে রাখি—
বিগ ব্যাং এর পর সমান পরিমাণ ম্যাটার এবং অ্যান্টি ম্যাটার তৈরি হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে এদের মধ্যে ম্যাটার ডোমিনেট করে, এবং এইজন্যই বর্তমান মহাবিশ্বের ম্যাটারের আধিপত্য দেখা যায়। এখন বিগ ব্যাং এর পর কেন ম্যাটার ডোমিনেট করেছিল, তা সিপি ভায়োলেশনের মাধ্যমে দেখা যায়।
এই চারটি মেইন ডিটেক্টর ছাড়াও এলএসসিতে আরো পাঁচটি ছোট ডিটেক্টর রয়েছে, যাদের একেকটি একেক ধরনের কাজে ব্যবহার করা হয়। এলিসিতে প্রতিবছর প্রায় ৩০,০০০,০০০ গিগাপাইটি ডাটা তৈরি হয়, এত বিপুল পরিমাণ ডাটা একসাথে রাখা সম্ভব।
যার ফলে এলিসি স্থাপনের আগেই একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে ডাটাকে বিভিন্ন স্থানের বিভিন্ন কম্পিউটারে ভাগ করা যায়, এবং এটাই ছিল ডাবলু এডাব্লিউ বা ওয়ার্ল্ড হোয়াইট ওয়েটের সূচনা। এবং এটি হয়েছিল সারনে টিম বেয়ারনেস লিয়ের হাত ধরে ১৯৯০ সালে।
যাইহোক এবার এলিসি থেকে ব্ল্যাকহোল তৈরি হবে এমন আশঙ্কা সম্পর্কে বলা যাক। এলএসসিতে এক্সপেরিমেন্ট চলার সময় প্রোটনের রেস্ট ম্যাসের তুলনায় ৭,০০০ গুণ বেশি ভারী হয়ে থাকে, তারমানে ক্ষুদ্র স্থানে বেশি এনার্জি। এখন উচ্চশক্তির দুইটি প্রোটন যখন সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন ঠিক ঐ মুহূর্তে একটি ক্ষুদ্র স্থানে ১৪ টিডিয়ান ইলেকট্রোভল্ট এনার্জি একইভূত হয়।
এখন ক্ষুদ্র স্থানে এত বেশি এনার্জি মানে বেশি ভর, যার ফলে ওই স্থানে ব্ল্যাকহোল তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কা অনেকেই করেছিলেন, যার ফলে এলএসসি পৃথিবীকে ধ্বংস করে দেবে এমন কথাও সামনে এসেছিল, যদিও বাস্তবে এমন কিছুই ঘটেনি, এমনকি সাইন্টিস্টরাও মাইক্রো ব্ল্যাকহোল তৈরি হয়েছে এমন কিছু টিকেট করতে পারেননি।
তবে আমরা যদি ধরেই নেই এলএসসিতে মাইক্রো ব্ল্যাকহোল তৈরি হবে, তবুও কিন্তু এটি পৃথিবীতে ব্রাশ করতে পারবে না, কারণ হকিং রেডিয়েশন থেকে আমরা জানি ব্ল্যাকহোলের সাইজ যত ছোট হবে, সেটি তত দ্রুত রেডিয়েশন নির্গত করে নিঃশ্বাস হয়ে যাবে। ব্ল্যাকহোল এবং হকিং রেডিয়েশনের বিষয়গুলো আমার এই ভিডিওতে বিস্তারিত বলা হয়েছে। লিংকস ডেসক্রিপশন বক্সে দেয়া থাকবে।
এলিসি তার সর্বোচ্চ সক্ষমতা অর্জন করেছে, অর্থাৎ এটি যতটা উচ্চশক্তির কলিশন ঘটাতে পারবে, তাই ইতিমধ্যে করে ফেলেছে, যা হচ্ছে চোদ্দটি জন ইলেকট্রোভল্ট, যার ফলে বর্তমানে এলএসসি থেকেও আরো বড় ১০০ কিলোমিটার পরিধির কোলাইডার তৈরির কথা সামনে এসেছে।
যাকে বলা হচ্ছে এসএসসি, বাফিউচার সার্কুলার কোলাইডার, যার শক্তি হবে ১০০ ট্রিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এফসি সির আদৌ কি কোন প্রয়োজন রয়েছে? এই বিষয়ে অবশ্যই যুক্তিতর্ক চলছে।
তবে ডার্ক ম্যাটার, অ্যাক্সিডেন্ট ম্যাটারের মত বহু কিছু সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান সীমিত। এপসিসির মত বিশাল কিছু একটা তৈরি হলে হয়তো এসবের উত্তর পাওয়া যেতে পারে। এর বাইরেও আরো সম্পূর্ণ নতুন কিছু আবিষ্কার হতে পারে।
মহাবিশ্বের সবচেয়ে ছোট জিনিস, অর্থাৎ এলিমিনেটরি পার্টিকল স্টাডি করতে গিয়ে মানুষকে সবচেয়ে বড় মেশিন তৈরি করতে হয়েছে, যে মেশিন কোন কিছুই উৎপাদন করে না, তবে মানুষের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে।
আমাদের অর্থনীতির জন্য টেক্সটাইল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। টেক্সটাইল শব্দটি ছোট হলেও এর মধ্যে বহু ধাপ রয়েছে। এই সবগুলো ধাপ অতিক্রম করার পর কাপড় তৈরি হয়। কাপড় তৈরি হবার পর বিদেশে রপ্তানি করার ক্ষেত্রে আবার বহু ধরনের টেস্ট রয়েছে।
টেক্সটাইলের যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে জানতে আমার এই ভিডিওটি দেখতে পারেন। ভিডিও ভালো লাগলে বিজ্ঞান পাইসি পরিবারে যুক্ত হয়ে সাথে থাকতে পারেন।
