Homeসহজ বিজ্ঞানল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ (Lagrange points missions) বিবরণ

ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ (Lagrange points missions) বিবরণ

চলুন জানি ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ (Lagrange points missions) সম্পর্কে: মহাজাগতিক যেকোনো দুইটি বস্তুর জন্য পাঁচটি এমন পয়েন্ট রয়েছে, যে পয়েন্টগুলোতে সামান্য ঘরের কোনো বস্তু রাখলে তা মেজর দুইটি বস্তুর সাপেক্ষে স্থির থাকে। এই পাঁচটি পয়েন্টকে বলা হয় ল্যাগরান্জ পয়েন্ট। সূর্য এবং পৃথিবীর সাপেক্ষে শ্রেষ্ঠ ল্যাগরান্জ পয়েন্টগুলো স্পেস গবেষণা সহ বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

এই পয়েন্টগুলো যেহেতু পৃথিবীর সাপেক্ষে স্থির থাকে, ফলে স্পেস ক্যাপ্টের সাথে যোগাযোগ স্মুথ থাকে। যার ফলে ইতিমধ্যেই সকল পয়েন্টগুলোতে বিভিন্ন মিশন পরিচালিত হয়েছে এবং ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ ভবিষ্যতে ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট নিয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে, যেমন স্পেস কলোনি স্থাপনের পরিকল্পনা।

গত আলোচনায় ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট কী এবং কীভাবে ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট কাজ করে এ বিষয়গুলো বলা হয়েছিল। আজকের ভিডিওতে ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে বলা হবে।

ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ

ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ (Lagrange points missions)
ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ (Lagrange points missions)

সূর্য এবং পৃথিবীর ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্টগুলো যেহেতু পৃথিবীর সাপেক্ষে স্থির থাকে, ফলে এই স্থানগুলোর বিভিন্ন ধরনের উপযোগিতা রয়েছে। এই পয়েন্টগুলোতে কোনো একটি স্পেসক্রাফটকে অতি অল্প জ্বালানি খরচ করে স্থির রাখা যায়।

ফলে এই স্থানগুলোতে কোনো একটি মিশন দীর্ঘ সময়ের জন্য পরিচালনা করা সম্ভব। এখন সূর্য এবং পৃথিবীর ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ সম্পর্কে বলা যাক।

সূর্য্য – পৃথিবী ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট এল-১ (Sun-Earth L1 Lagrange point Missions)

সূর্য্য ও পৃথিবীর এল-১ ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ
সূর্য্য ও পৃথিবীর এল-১ ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ

এলওয়ান ল্যাগরান্জ পয়েন্টের দূরত্ব পৃথিবী থেকে সূর্যের দিকে ১৫০,০০০ কিলোমিটার। ফলে সূর্যকে ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ করার জন্য এলওয়ান ল্যাগরান্জ পয়েন্ট একটি আদর্শ স্থান। কারণ, এই ক্ষেত্রে চাঁদ কখনোই স্পেসক্রাফটের সামনে আসবে না। তাছাড়া পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করার জন্যও এটি একটি চমৎকার স্থান।

এলওয়ান ল্যাগরান্জ পয়েন্টে পরিচালিত প্রথম মিশন ছিল ইন্টারন্যাশনাল সান আর্ট এক্সপ্রেস-৩, যা ১৯৭৮ সালে লঞ্চ করা হয়েছিল। এই মিশনের উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর ম্যাগনেটিক ফিল্ড এবং সোলার উইন্ডের মধ্যবর্তী ইন্টারঅ্যাকশন সম্পর্কে জানা। সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে লঞ্চ করা হয় সোলার অ্যান্ড হেলিওস্ফেরিক অবজারভেটরি (সংক্ষেপে সোহো)। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সূর্যকে টানা ২ বছর পর্যবেক্ষণ করা। যদিও সোহো এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং ২০২৫ সাল পর্যন্ত এর মিশন বৃদ্ধি করা হয়েছে।

১৯৯৭ সালের আগস্টে লঞ্চ করা হয় অ্যাডভান্সড কম্পোজিশন এক্সপ্রেস। নাসার জেনেসিস স্পেসক্রাফট ২০০১ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত সোলার উইন্ডের স্যাম্পল সংগ্রহ করে পৃথিবীতে নিয়ে আসে। ২০১৫ সালে লঞ্চ করা হয় নাসার ডিপ স্পেস ক্লাইমেট অবজারভেটরি (সংক্ষেপে ডিসকভার)। এটি ক্রমাগত সূর্যের সোলার উইন্ড পর্যবেক্ষণ করে এবং সৌরঝড়ের পূর্বাভাস দিয়ে থাকে। এছাড়াও পৃথিবীর ওজোন স্তর, আবহাওয়া পরিস্থিতি ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে।

২০১৫ সালে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি লিসা পাথফাইন্ডার এলওয়ানে পাঠায়। এর উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে স্পেসে গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরি স্থাপন করতে হলে প্রযুক্তি কেমন হওয়া উচিত তা বোঝা। এলওয়ানে বিভিন্ন মিশন পরিচালিত হলেও বর্তমানে এলওয়ানের সক্রিয় মিশনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সোহো। এছাড়াও রয়েছে নাসার উইন্ড স্যাটেলাইট, যা সোলার উইন্ডের ফলে সৃষ্ট রেডিও ওয়েভ, প্লাজমা এবং পৃথিবীর ম্যাগনেটোস্ফিয়ার নিয়ে গবেষণা করে।

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লঞ্চ করা হয় ঈশা’র আদিত্য এলওয়ান। এর কাজ হলো সোলার করোনার স্টাডি করা। এতক্ষণে এলওয়ান ল্যাগরান্স পয়েন্টে পরিচালিত মিশনের কথা বলা হলো।

এখন বলা যাক ভবিষ্যতে এল ওয়ানের ব্যাপারে কেমন চিন্তাভাবনা চলছে। জলবায়ু পরিবর্তনকে ধীর করার ক্ষেত্রে এলওয়ান পয়েন্ট নিয়ে বিজ্ঞানীরা চমৎকার আইডিয়া দিয়েছেন। যেমন, ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারিজোনার রজার অ্যাঞ্জেল বলেন, ছোট ছোট স্পেসক্রাফট দিয়ে এক ধরনের ক্লাউড তৈরি করে এলওয়ান পয়েন্টে রাখলে এই ক্লাউড সূর্যের কিছুটা আলো আটকে দেবে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি দীর্ঘ সময়ে সংঘটিত হবে।

আবার অনেকে এল ওয়ান পয়েন্টে সানশিল্ড স্থাপনের প্রস্তাব করেছেন। তবে যেমনটাই করা হোক না কেন, তা একটি বিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তাছাড়া যে পরিমাণ ম্যাটেরিয়াল প্রয়োজন হবে, তা হবে বিশাল। ফলে এই বিষয়গুলো আপাতত শুধুমাত্র ধারণাগত।

আবার অনেকে সূর্য এবং মঙ্গল গ্রহের এল ওয়ান পয়েন্টে আর্টিফিশিয়াল ম্যাগনেটোস্ফিয়ার তৈরি করার প্রস্তাব করেছেন, যা সূর্যের সোলার উইন্ড আটকাবে। এতে মঙ্গল গ্রহ বর্তমানে যেমন শুষ্ক মরুভূমি, তেমন থাকবে না।

এমনটি করলে মঙ্গল গ্রহ হয়তো সজীব হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে, সূর্য এবং শুক্র গ্রহের এলওয়ান পয়েন্টে সানশিল্ড স্থাপন করতে পারলে শুক্র গ্রহে আমাদের জন্য সুবিধাজনক পরিবর্তন আসতে পারে। পৃথিবী এবং চাঁদের এলওয়ান পয়েন্ট ভবিষ্যতে চাঁদের বিভিন্ন মিশনের ক্ষেত্রে খুবই আদর্শ স্থান হতে পারে।

এল-২ ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশন (Sun-Earth L2 Lagrange point Missions)

ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ (Lagrange points missions) বিবরণ - l2 Lagrange
এল-২ পয়েন্টে ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ (Lagrange points missions)

সূর্য এবং পৃথিবীর ল্যাগরান্স পয়েন্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ব্যস্ত পয়েন্ট হচ্ছে এল টু পয়েন্ট। এল টু পয়েন্ট এল ওয়ানের মতোই পৃথিবী থেকে ১৫,০০,০০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, তবে এটি পৃথিবী থেকে সূর্যের বিপরীত দিকে।

স্পেস টেলিস্কোপের ক্ষেত্রে সূর্য, পৃথিবী এবং চাঁদ—এই তিনটি যথেষ্ট উজ্জ্বল অবজেক্ট, যা আকাশ পর্যবেক্ষণে সমস্যা তৈরি করে। কিন্তু এলটু পয়েন্টে টেলিস্কোপ বসালে এই সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। কারণ, এল টু থেকে এই তিনটি অবজেক্ট টেলিস্কোপের একটি ক্ষুদ্র অংশকে ব্লক করে। ফলে এই তিনটি অবজেক্ট খুব বেশি সমস্যা তৈরি করতে পারে না। এই কারণেই এখন পর্যন্ত ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ (Lagrange points missions) এল টু তে পাঠানো স্পেসক্রাফটের মধ্যে বেশিরভাগই স্পেস টেলিস্কোপ।

এল টু তে পাঠানো ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ (Lagrange points missions) স্পেসক্রাফটগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে নাসার উইকিনসন মাইক্রোওয়েভ অ্যানিসোট্রোপি প্রোব (সংক্ষেপে ডব্লিউ ম্যাপ), যা ২০০১ সালের জুনে লঞ্চ করা হয়। এটি প্রায় ৯ বছর এলটুতে অবস্থান করে এবং কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের ম্যাপিং করে। এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের বয়স, ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। ২০১০ সালে ডব্লিউ ম্যাপের জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। বর্তমানে এটি এলটু থেকে দূরে কোনো একটি হেলিওসেন্ট্রিক কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে, যেখানে এটি পরবর্তী কয়েক কোটি বছর ধরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে।

ডব্লিউ ম্যাপের পর এলটুতে পাঠানো হয় নাসার হার্শেল স্পেস অবজারভেটরি, যা ২০০৯ সালে লঞ্চ করা হয়েছিল। এটি ওই সময়ের জন্য সবচেয়ে বড় ইনফ্রারেড টেলিস্কোপ ছিল। ২০১৩ সালে হার্শেলের জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকে এটি ডব্লিউ ম্যাপের মতোই হেলিওসেন্ট্রিক কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে।

ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি ২০০৯ সালে প্ল্যাঙ্ক স্পেস অবজারভেটরি পাঠায়। এটি মূলত ডব্লিউ ম্যাপের সফল উত্তরসূরি হিসেবে কাজ করেছে। এর মাধ্যমে কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের আরো বিস্তারিত ছবি পাওয়া গেছে। ২০১৩ সালে প্ল্যাঙ্কের মিশন শেষ হয়, এবং এটি এখন হেলিওসেন্ট্রিক কক্ষপথে রয়েছে।

এরপর আসে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির গাইয়া মিশন, যা ২০১৩ সালে লঞ্চ করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির মানচিত্র তৈরি করা। ২০১৩ থেকে এখন পর্যন্ত গাইয়া কোটি কোটি তারার মানচিত্র তৈরি করেছে। এটি ২০২৫ সাল পর্যন্ত কাজ করবে, এবং মিশন শেষে গাইয়ার মাধ্যমে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একটি ত্রিমাত্রিক মানচিত্র পাওয়া যাবে।

এরপর রাশিয়া এবং জার্মানির সম্মিলিত উদ্যোগে লঞ্চ করা হয় স্পেকট্রাম-আরজি। এটি মূলত একটি এক্স-রে টেলিস্কোপ, যা মহাবিশ্বের হাই এনার্জি অঞ্চলগুলো পর্যবেক্ষণ করে। এর মাধ্যমে গ্যালাক্সি ক্লাস্টার, ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল এবং নিউট্রন স্টারসহ উচ্চ-শক্তির অবজেক্ট ডিটেক্ট করা সম্ভব।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে লঞ্চ করা হয় জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। এটি এলটুতে অবস্থান করে কাজ করছে। জেমস ওয়েবসহ অন্যান্য স্পেসক্রাফট ল্যাগরান্জ পয়েন্টে সরাসরি অবস্থান না করে, ল্যাগরান্জ পয়েন্টকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে (হ্যালো অরবিট) ঘোরে। এটি স্পেসক্রাফটকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।

সাম্প্রতিক মিশনের মধ্যে রয়েছে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির ইউক্লিড, যা ২০২৩ সালের জুলাই মাসে লঞ্চ করা হয়। এটি একটি ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল স্পেস টেলিস্কোপ। ইউক্লিডের ৬০০ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা আছে, যা দৃশ্যমান আলো এবং নিকট-ইনফ্রারেড স্পেকট্রাম রেকর্ড করবে। এর মাধ্যমে গ্যালাক্সির গতিশীলতা এবং মহাবিশ্বের প্রসারণের কারণ সম্পর্কে গবেষণা করা যাবে।

উল্লেখিত মিশনগুলোর বাইরেও এলটু পয়েন্টে ভবিষ্যতে অনেক মিশন পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে, যেমন ডব্লিউ ফাস্ট এবং লাইসা।

Sun-Earth L3 Lagrange point Missions

সূর্য এবং পৃথিবীর এল-থ্রি ল্যাগ্রেঞ্জ পয়েন্টে এখন পর্যন্ত কোনো মিশন পরিচালনা করা হয়নি। কারণ এই পয়েন্ট প্রায় ব্যবহারিকভাবে অপ্রয়োজনীয়।

এই পয়েন্টে যদি কোনো স্পেসক্রাফট পাঠানো হয় তবে এর সাথে যোগাযোগের জন্য দ্বিতীয় আরেকটি স্পেসক্রাফটের প্রয়োজন পড়বে। কারণ এল-থ্রির সাথে পৃথিবীর সরাসরি যোগাযোগ করার কোনো সুযোগ নেই। তাই এল-৩ ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ (Lagrange points missions) কোনো তথ্য নেই।

এল-৪ ও এল-৫ ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশন (Sun-Earth L4 and L5 Lagrange point Missions)

এল-৪ এবং এল-৫ ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ (Lagrange points missions)
এল-৪ এবং এল-৫ ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ (Lagrange points missions)

সূর্য এবং পৃথিবীর এল-ফোর এবং এল-ফাইভ স্থিতিশীল হওয়ার পরেও এখনো পর্যন্ত এই পয়েন্টগুলোতে কোনো মিশন পরিচালনা করা হয়নি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই পয়েন্টগুলোতে মিশন পরিচালনা করা হয়নি? আসলে এল-থ্রি-এর মতো এই দুইটি পয়েন্টের উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবহারিক প্রয়োগ নেই।

তবে পৃথিবী এবং সূর্যের এল-ফোর এবং এল-ফাইভ-এ মিশন পরিচালনা না হলেও সূর্য এবং বৃহস্পতির এল-ফোর এবং এল-ফাইভ পয়েন্টে ইতোমধ্যে মিশন পরিচালনা করা হয়েছে। এবং তা হচ্ছে নাসার লুসি মিশন। লুসি ১২ বছরে আটটি ভিন্ন অ্যাস্টারয়েডে যাত্রা করবে। এই আটটি অ্যাস্টারয়েডের মধ্যে দুইটি হচ্ছে মেইন বেল্ট অ্যাস্টারয়েড এবং বাকি ছয়টি হচ্ছে সূর্য এবং বৃহস্পতির এল-ফোর এবং এল-ফাইভ-এ থাকা ট্রোজান অ্যাস্টারয়েড।

পৃথিবী এবং সূর্যের এল-ফোর এবং এল-ফাইভ-এর ব্যবহারিক কোনো প্রয়োজন না থাকলেও এই পয়েন্টগুলো নিয়ে বিভিন্ন আইডিয়া বিজ্ঞানীরা উপস্থাপন করে যাচ্ছেন। যেমন এল-থ্রি, এল-ফোর এবং এল-ফাইভ এই তিনটি ল্যাগ্রেঞ্জ পয়েন্টে তিনটি ডিভাইস বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যা গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ডিটেক্টর হিসেবে কাজ করবে।

পৃথিবীতে থাকা গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ডিটেক্টরকে বিভিন্ন নয়েজের মধ্যে কাজ করতে হয়। কিন্তু মহাকাশের ক্ষেত্রে নয়েজের বিষয়টি অনেক কমে যায় এবং বিশাল এরিয়া জুড়ে গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ডিটেক্ট করা সম্ভব হয়। এর ফলে মহাবিশ্বের বিভিন্ন মহাজাগতিক বিষয়গুলো আরো বিস্তারিতভাবে জানা যাবে।

এছাড়াও পৃথিবী এবং চাঁদের এল-ফোর এবং এল-ফাইভ-এ স্পেস স্টেশন স্থাপনের বিভিন্ন আইডিয়া রয়েছে। যার মধ্যে একটি হলো ১৯৭৬ সালে জেরার্ড ও’নিলের বিশাল সিলিন্ডার আকৃতির স্পেস স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা। এই আইডিয়া অনুযায়ী পৃথিবী এবং চাঁদের এল-ফাইভ পয়েন্টে বিশাল সিলিন্ডার আকৃতির স্পেস স্টেশন স্থাপন করা যাবে, যাতে ১০,০০০ মানুষের বসবাসের সুযোগ থাকবে। এই সিলিন্ডারের ভিতরে যেহেতু পৃথিবীর মতো গ্র্যাভিটি থাকবে না, ফলে স্পেসক্রাফটকে সবসময় ঘোরানো হবে। এর ফলে সেখানে কেন্দ্রবিমুখী বল তৈরি হবে এবং আর্টিফিশিয়াল গ্র্যাভিটি সৃষ্টি হবে।

আর্টিফিশিয়াল গ্র্যাভিটি সম্পর্কে সংক্ষেপে উল্লেখ করা যাক। আপনি যদি একটি গ্লাসে পানি নিয়ে সেটিকে একটি সেটআপের মধ্যে বসিয়ে ঘোরাতে থাকেন, তবে গ্লাসের পানি কখনোই গ্লাস থেকে বেরিয়ে আসবে না। এর কারণ হলো গ্লাসটিকে ঘোরানোর ফলে গ্লাসে থাকা পানি গ্লাসের নিচের দিকে বল অনুভব করবে।

ঠিক একইভাবে, পানির স্থানে যদি আমরা একজন মানুষকে কল্পনা করি তবে গ্লাসটি ঘোরানোর সময় মানুষটি তার পায়ের দিকে বল অনুভব করবে। এর ফলে মানুষটি গ্লাসের ভেতরে পৃথিবীর মতো আর্টিফিশিয়াল গ্র্যাভিটি অনুভব করবে।

গোলাকার সিলিন্ডারের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে। সিলিন্ডার যেহেতু সবসময় ঘুরবে, ফলে এতে থাকা মানুষ কেন্দ্রবিমুখী বলের ফলে পৃথিবীর মতো গ্র্যাভিটি অনুভব করবে। তবে পৃথিবী এবং চাঁদের এল-ফাইভ-এ স্পেস কলোনি স্থাপনের ক্ষেত্রে সৌর বিকিরণ (Solar Radiation) একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পৃথিবীর ম্যাগনেটোস্ফিয়ার সূর্যের সৌর বিকিরণ থেকে পৃথিবীকে সুরক্ষিত রাখে। কিন্তু স্পেস কলোনির ক্ষেত্রে এই সুরক্ষা থাকবে না। কারণ স্পেস কলোনি পৃথিবীর ম্যাগনেটোস্ফিয়ারের বাইরে অবস্থিত। ফলে সেখানে কৃত্রিমভাবে সৌর বিকিরণ আটকানোর ব্যবস্থা করতে হবে।

তাছাড়া এত বিশাল গ্র্যাভিটি তৈরি করার ক্ষেত্রে কিছু টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেইসাথে এত বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল মহাকাশে নিয়ে যাওয়াও একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। যার ফলে আপাতত স্পেস কলোনির বিষয়টি একটি সায়েন্স ফিকশন মাত্র। তবে ভবিষ্যতে এই ফিকশন বাস্তবে রূপ নিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ বর্তমানে আমরা এমন অনেক কিছুই ব্যবহার করছি, যা একসময় ছিল সায়েন্স ফিকশন।

ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট মিশনসমূহ (Lagrange points missions) নিয়ে আরও বিস্তারিত জানার জন্য এই ভিডিওটি দেখুন

সৌজন্যে: বিজ্ঞান পাইসি ইউটিউব চ্যানেল

নিউটন তার মহাকর্ষের তত্ত্ব দেওয়ার পর নতুন একটি বিষয় সামনে আসে এবং তা হচ্ছে থ্রি-বডি প্রবলেম। পরবর্তীতে এই থ্রি-বডি প্রবলেমের সমাধান খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে ল্যাগ্রেঞ্জ পয়েন্ট। থ্রি-বডি প্রবলেম এবং ল্যাগ্রেঞ্জ পয়েন্ট সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এটি পড়ুন। এই রকম চমকপ্রদ বিভিন্ন বিজ্ঞান সংক্রান্ত তথ্য পেতে বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিভাগ দেখুন।

তথ্য সূত্র (Sources):

  • ১. বিজ্ঞান পাইসি ইউটিউট চ্যানেল (https://youtu.be/-P13O4usL3c)
  • ২. নাসা জেট প্রপালসান ল্যাবরেটরি (https://www.jpl.nasa.gov/missions/genesis/)
  • ৩. ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (https://www.esa.int/)

Share: 

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি