Homeসহজ বিজ্ঞানহিগস বোসন বা গড পার্টিকেল, হিগস মেকানিজম – God Particle Higgs Boson and Higgs Mechanism

হিগস বোসন বা গড পার্টিকেল, হিগস মেকানিজম – God Particle Higgs Boson and Higgs Mechanism

হিগস বোসন বা গড পার্টিকেল, হিগস মেকানিজম - God Particle Higgs Boson and Higgs Mechanism

আমাদের সকলেরই ভর রয়েছে, কিন্তু আমরা সেই ভর অনুভব করি না, তবে আমরা ওজন অনুভব করি। ওজন হচ্ছে ভর এবং অভিকর্ষ তরুণের গুণফল। অভিকর্ষ তরুণের তারতম্যের কারণে কোনো একটি বস্তুর ওজন বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। যেমন, ইন্টারন্যাশনাল স্পেসশিপ এর মধ্যে অভিকর্ষ তরুণ জি এর মান ০, ফলে সেখানে থাকা নভোচারীরা কোনো প্রকার ওজন অনুভব করেন না, ফলে তারা ভাসে।

এখন, ওজন বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকম হলেও বস্তুর ভর সকল স্থানে একই থাকবে। পৃথিবীতে আপনার ভর যদি ৫০ কেজি হয়, তাহলে চাঁদেও আপনার ভর ৫০ কেজি থাকবে। অর্থাৎ, ভর স্থাননিরপেক্ষ একটি বিষয়। এখন যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয়, বস্তুর মধ্যে ভর আসে কোথা থেকে? উত্তরটা সহজ—বস্তুটি যা দিয়ে তৈরি তা থেকে, অর্থাৎ পরমাণু থেকে।

এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, ঐ সকল পরমাণুতে ভর আসে কোথা থেকে? এক্ষেত্রে উত্তরটি হচ্ছে পরমাণুতে থাকা মৌলিক কণা থেকে, অর্থাৎ কুয়ার্ক, ইলেকট্রন, প্রোটন এগুলো থেকে। এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, মৌলিক কণাগুলো তো জাস্ট ওয়েভ—এদের সলিড কোনো স্ট্রাকচার নেই, তাহলে এই সকল মৌলিক কণার ভর আসে কোথা থেকে?

এই উত্তরটি হয়তো অনেকেরই জানা, তবে সুদীর্ঘ সময় পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের এই প্রশ্নের উত্তর জানা ছিল না। খুব বেশিদিন হয়নি—মাত্র ১০ বছর আগে, অর্থাৎ ২০১২ সালে মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছে। ১৯৬৪ সালে থিওরিটিক্যাল ফিজিসিস্ট পিটার হিগস বস্তুর ভরসম্পৃক্ত একটি থিওরি দেন।

তার ম্যাথমেটিক্স অনুযায়ী, বিগ ব্যাং-এর পরবর্তী মুহূর্তেই একটি অদৃশ্য এনার্জি ফিল্ড স্পেসে ছড়িয়ে পড়ে এবং বর্তমানে মহাবিশ্বের সকল স্থানেই এই অদৃশ্য এনার্জি ফিল্ডের উপস্থিতি রয়েছে। তার থিওরি অনুযায়ী, এই এনার্জি ফিল্ড নির্দিষ্ট কিছু মৌলিক কণাকে প্রভাবিত করে অনেকটা চুম্বকের মতো। চুম্বক যেমন সকল বস্তুকে আকর্ষণ বা প্রভাবিত করে না, তেমনি এই অদৃশ্য এনার্জি ফিল্ড সকল মৌলিক কণাকে প্রভাবিত করে না।

কিন্তু কিছু কিছু মৌলিক কণাকে প্রভাবিত করে। বর্তমানে আমরা এই অদৃশ্য এনার্জি ফিল্ডকে হিগস ফিল্ড হিসেবে জেনে থাকি। থিওরি অনুযায়ী, কোনো একটি পার্টিকেল হিগস ফিল্ডের সাথে যত বেশি ইন্টারঅ্যাক্ট করবে, তার ভর তত বেশি হবে। এবং কোনো পার্টিকেল যদি হিগস ফিল্ডের সাথে ইন্টারঅ্যাক্ট না করে, তবে ওই বস্তুর ভর হবে ০।

যাই হোক, প্রথমেই এই এনার্জি ফিল্ড বা হিগস ফিল্ড কেমন তা বলা যাক। হিগস ফিল্ড বিষয়টি বোঝার জন্য পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কথা বিবেচনা করা যাক। পৃথিবীপৃষ্ঠের সকল স্থানে বায়ুমণ্ডলের উপস্থিতি রয়েছে, কিন্তু আমরা পৃথিবীপৃষ্ঠে থাকাকালীন এই বায়ুমণ্ডলের উপস্থিতি বুঝতে পারি না, কারণ আমরা বলতে গেলে এই বায়ুমণ্ডলের মধ্যে ডুবে আছি। আপনাকে যদি বলা হয়—আপনি কি বায়ুমণ্ডল বা বায়ুকে দেখতে পান?

নিশ্চিতভাবে উত্তর হবে না। কিন্তু এর মানে তো এই নয় যে বায়ুমণ্ডল নেই। বায়ুমণ্ডল ঠিকই রয়েছে, তবে তা সরাসরি দেখা যায় না। ঠিক তেমনই হিগস ফিল্ড অদৃশ্য একটি এনার্জি ফিল্ড, যা মহাবিশ্বের সকল স্থানে বিরাজ করছে এবং এই হিগস ফিল্ডের কারণেই কোনো একটি বস্তু ভরপ্রাপ্ত হয়। পিটার হিগস তার এই থিওরি একটি জার্নালে পাঠালে প্রথমে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। পরবর্তীতে পিটার হিগস এই থিওরি নিয়ে আরও কাজ করেন। তিনি বলেন, যদি হিগস ফিল্ডের অস্তিত্ব সত্যিকার অর্থে থেকে থাকে, তবে এই ফিল্ডকে পার্টিকেল ফর্মে নিয়ে আসা সম্ভব এবং যার মাধ্যমে হিগস ফিল্ড শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

অর্থাৎ, যদি দুটি পার্টিকেলের মধ্যে যথেষ্ট শক্তিশালী সংঘর্ষ ঘটানো যায়, তবে তা থেকে হিগস ফিল্ডে দ্বিপল তৈরি হবে বা আলোড়ন সৃষ্টি হবে, ফলে খুবই স্বল্প সময়ের জন্য হিগস ফিল্ড পার্টিকেল ফর্মে দৃশ্যমান হবে। বিষয়টি আরও সহজভাবে বোঝাতে গেলে বলা যায়, নদীতে থাকা পানিকে হিগস ফিল্ড হিসেবে বিবেচনা করুন। এখন সাধারণ অবস্থায় নদীর পানি কোনো কারণে আলাদা হয় না। কিন্তু যদি এই নদীতে দুটি নৌকা মুখোমুখি সংঘর্ষ করে, তবে পানিতে একটি আলোড়ন তৈরি হয়, যার ফলে কিছু পানি ছিটকে যায় বা আলাদা হয়। অর্থাৎ খুব স্বল্প সময়ের জন্য নদীর পানি নদী থেকে আলাদা হয়ে পড়ে।

ঠিক তেমনই, দুটি পার্টিকেলের মধ্যে শক্তিশালী সংঘর্ষ হলে হিগস ফিল্ডে আলোড়ন তৈরি হয় এবং সে সময় হিগস ফিল্ড থেকে একটি পার্টিকেল আলাদা হয়ে যায়, যাকে ডিটেক্ট করতে পারলেই হিগস ফিল্ডের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, কোনো একটি বস্তুতে কিভাবে ভর তৈরি হয়। এই বিষয়টি পরবর্তীতে একটি আমেরিকান জার্নালে প্রকাশিত হয় এবং পিটার হিগসকে যথাযথ সম্মান প্রদান করা হয়। যদিও এই এনার্জি ফিল্ড বা হিগস ফিল্ড আবিষ্কারের পেছনে আরও অনেক বিজ্ঞানীর অবদান রয়েছে।

এখন বলা যাক, হিগস ফিল্ড কিভাবে পার্টিকেলকে ভর প্রদান করে। কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি অনুযায়ী, প্রত্যেকটি মৌলিক পার্টিকেলের জন্য একটি নির্দিষ্ট ফিল্ড রয়েছে। এই ফিল্ডে শক্তি প্রয়োগ করলে সংশ্লিষ্ট পার্টিকেল তৈরি হয়। যেমন—ইলেকট্রন ফিল্ডে শক্তি দিলে ইলেকট্রন তৈরি হয়, কোয়ার্ক ফিল্ডে শক্তি দিলে কোয়ার্ক তৈরি হয়। এই সকল ফিল্ড পরস্পরের মধ্যে ইন্টারঅ্যাক্ট করে।

পিটার হিগসের মতে, এই সকল ফিল্ডের মতই একটি অতিরিক্ত ফিল্ড রয়েছে, যেটি হলো হিগস ফিল্ড। এই ফিল্ডে এনার্জি প্রদান করার ফলে তৈরি হয় হিগস বাজন বা গড পার্টিকেল। প্রাথমিকভাবে সকল পার্টিকেল ফোটনের মতই ভরহীন থাকে। এই ভরহীন পার্টিকেলগুলো যখন হিগস ফিল্ডে প্রবেশ করে, তখনই তাদের মধ্যে ভর তৈরি হয়। আর যে পার্টিকেল হিগস ফিল্ডের সঙ্গে যত বেশি ইন্টারঅ্যাক্ট করে, তার ভর তত বেশি হয়।

তার ভর বেশি হবে এবং যারা কম ইন্টারঅ্যাক্ট করবে, তাদের ভর কম হবে। যেমন ফোটোন হিগস ফিল্ডের সাথে ইন্টারঅ্যাক্ট করে না, ফলে ফোটোনের ভর শূন্য। ইলেকট্রন হিগস ফিল্ডের সাথে কম ইন্টারঅ্যাক্ট করে, ফলে ইলেকট্রনের ভর কম। অন্যদিকে কুয়ার্ক হিগস ফিল্ডের সাথে বেশি ইন্টারঅ্যাক্ট করে, যার ফলে কুয়ার্কের ভর বেশি হয়ে থাকে।

এই বিষয়টিকে একটি ক্লাসিক্যাল উদাহরণের মাধ্যমে বলা যাক। মনে করুন আমি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাব এবং এই ক্ষেত্রে আমার কোনো সমস্যা হবে না, কারণ আমাকে কেউ চেনে না। ফলে আমি সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারব।

কিন্তু ওই একই স্থান যদি কোনো একজন সেলিব্রিটি অতিক্রম করার চেষ্টা করেন, তবে মানুষজন তাকে ঘিরে ধরবে। ফলে ওই সেলিব্রিটির ওই স্থানটি অতিক্রম করতে অনেক বেশি সময় লাগবে। এই উদাহরণের ক্ষেত্রে আমাকে ফোটোন বিবেচনা করুন এবং মানুষজনকে হিগস ফিল্ড মনে করুন।

তাহলে এক্ষেত্রে আমার সাথে মানুষজনের কোনো প্রকার ইন্টারঅ্যাক্ট হবে না, ফলে আমার ভর ০ থাকবে। অন্যদিকে যে সেলিব্রিটি এই স্থানটি অতিক্রম করার চেষ্টা করছেন, তাকে কুয়ার্ক বিবেচনা করুন। ওই সেলিব্রিটি যখন স্থানটি অতিক্রম করার চেষ্টা করবেন, তখন মানুষজনের সাথে তার বেশি ইন্টারঅ্যাক্ট হবে।

অর্থাৎ, হিগস ফিল্ডের সাথে কুয়ার্কের বেশি ইন্টারঅ্যাক্ট হবে, যার ফলে কুয়ার্ক ভরপ্রাপ্ত হবে। এভাবেই, কোনো একটি পার্টিকেল হিগস ফিল্ডের সাথে যতটা ইন্টারঅ্যাক্ট করে, তার ততটাই ভর তৈরি হয়।

এখানে একটি বিষয় বলা দরকার—অনেকে মনে করেন, হিগস বাজন বা গড পার্টিকেল বস্তুর ভর তৈরি করে। কিন্তু এটা সঠিক নয়। বস্তুর ভর তৈরি হয় মূলত হিগস ফিল্ডের কারণে। হিগস ফিল্ড থেকে যে পার্টিকেল তৈরি হয়, তাকে বলা হয় হিগস বাজন বা গড পার্টিকেল।

অর্থাৎ, হিগস ফিল্ডের পার্টিকেল ফর্ম হচ্ছে গড পার্টিকেল। এখন এই হিগস বাজনকে কেন গড পার্টিকেল বলা হয়, তা বলা যাক। প্রথমেই বলেছি, হিগস ফিল্ড বস্তুকে ভর প্রদান করে। এখন এই হিগস ফিল্ড যদি না থাকত, তবে সকল ফান্ডামেন্টাল পার্টিকেল ভরহীন হতো।

আর আমরা জানি, ভরহীন বস্তু সব সময় আলোর গতিতে চলতে থাকে। সুতরাং, যদি হিগস ফিল্ড না থাকত, তবে সকল পার্টিকেল আলোর গতিতে চলত। ফলে নিউট্রন, প্রোটন একসাথে থাকতে পারত না। এমনকি ইলেকট্রনও নির্দিষ্ট কক্ষপথে অবস্থান করতে পারত না।

ফলে পরমাণু গঠিত হতো না। অর্থাৎ, মহাবিশ্বের কোনো বস্তুই গঠিত হতো না। সুতরাং, এই দৃশ্যমান মহাবিশ্ব গঠনের ক্ষেত্রে হিগস ফিল্ড খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তবে এই কারণেই কিন্তু “গড পার্টিকেল” নাম আসেনি।

গড পার্টিকেল নামের পেছনে একটি কাহিনি রয়েছে। ১৯৯৩ সালে ফিজিসিস্ট লিওন লেডারম্যান এই ভরসম্পর্কিত একটি বই লেখেন। তিনি ওই বইয়ের নাম দিতে চেয়েছিলেন “The Goddamn Particle”, কিন্তু প্রকাশক এই নামটি পছন্দ করেননি। ফলে তিনি নাম পরিবর্তন করে রাখেন “The God Particle”।

যদিও ওই নামের পেছনে তেমন কোনো যুক্তি ছিল না। এটি প্রকাশকের কাছে শুধুমাত্র একটি সুন্দর নাম ছিল। কিন্তু এই “গড পার্টিকেল” নামটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

তখনকার সাংবাদিকরা এতটাই প্রচার করেন যে এরপর থেকে এক্সপোজনের নাম হয়ে যায় গড পার্টিকেল। যাইহোক, ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত হিক্সফিল্ডের ধারণা শুধুমাত্র থিওরিতেই সীমাবদ্ধ ছিল, কারণ তখন পর্যন্ত হিক্সফিল্ড থেকে সৃষ্ট পার্টিকেল, অর্থাৎ হিক্সবজন, ডিটেক্ট করা সম্ভব হয়নি। যদিও সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত সার্ন-এর বিজ্ঞানীরা হিক্সবজন ডিটেক্ট করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন। সার্নে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী অ্যাটম স্ম্যাশার। এটি মাটি থেকে তিনশো ফিট গভীরে অবস্থিত। সেখানে উচ্চগতিসম্পন্ন পার্টিকেলের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটানো হয় এবং এই সংঘর্ষের মাধ্যমে গড পার্টিকেল ডিটেক্ট করার সম্ভাবনা ছিল। এবং সেই লক্ষ্যে বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছিলেন।

অবশেষে ২০১২ সালের ৪ জুলাই হিক্সবজন বা গড পার্টিকেল ডিটেক্ট করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। যার ফলস্বরূপ ২০১৩ সালে পিটার হিগস এবং ফ্রঁসুয়া আংগলেয়ার এই দুইজনকে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ভর সৃষ্টির মেকানিজম নিয়ে কাজ করার অবদানের জন্যই তাদের এই সম্মাননা প্রদান করা হয়। যাইহোক, এবার বলা যাক বিজ্ঞানীরা কিভাবে গড পার্টিকেল ডিটেক্ট করেছিলেন।

এই যে গ্রাফটি দেখছেন, এর মাধ্যমে হিক্সবজনের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়। গ্রাফের এই উঁচু অংশটি হিক্সবজন নির্দেশ করে। কিন্তু সেটা কিভাবে? লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার বা এলএইচসিতে প্রোটনের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটানো হয় এবং প্রোটন সংগ্রহ করা হয় হাইড্রোজেন থেকে। হাইড্রোজেনে রয়েছে একটি ইলেকট্রন। ফলে সেই ইলেকট্রনটিকে কোনোভাবে সরিয়ে ফেললেই পাওয়া যায় প্রোটন।

যাইহোক, এলএইচসিতে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০০ কোটি সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। এদের মধ্যে খুবই কম সংখ্যক সংঘর্ষ মুখোমুখি সংঘটিত হয় এবং যে কয়টি সংঘর্ষ মুখোমুখি হয় তা থেকে মাঝে মধ্যে হিক্সবজন উৎপন্ন হয়। হিসেব করে দেখা গেছে যে, গড়ে প্রতি একশো কোটি সংঘর্ষের মধ্যে একটি হিক্সবজন উৎপন্ন হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোটি কোটি সংঘর্ষ থেকে কিভাবে হিক্সবজন আলাদা করে শনাক্ত করা হয়?

এই বিষয়টি বুঝতে হলে প্রথমে শক্তি বা এনার্জি সম্পর্কে ধারণা দরকার। আমরা জানি এনার্জি বস্তুর একটি বৈশিষ্ট্য, যেমন গতিশীল বস্তুর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গতি। ঠিক তেমনি, যেকোনো বস্তুর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এনার্জি। এবং যেকোনো বস্তুর ভর, এনার্জি বা শক্তির সমানুপাতিক। অতএব E = mc² এই সমীকরণ থেকে দেখা যায়, এনার্জিকে ভরের রূপান্তর সম্ভব। আবার ভরকে এনার্জিতেও রূপান্তর সম্ভব। এলএইচসিতে মূলত এনার্জিকে ভরের রূপান্তর করা হয় এবং সেই ভর বিভিন্ন পার্টিকেলের রূপে বের হয়ে আসে।

এলএইচসিতে দুইটি প্রোটনকে প্রায় আলোর বেগের কাছাকাছি গতিতে গতিশীল করা হয়, যার ফলে খুবই হালকা ভরের প্রোটন উচ্চগতিশক্তি প্রাপ্ত হয়। এখন এই উচ্চ গতি শক্তি সম্পন্ন দুইটি প্রোটন যখন সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন এই গতিশক্তি ভরের রূপান্তর হয় এবং এই ভরকে আমরা বিভিন্ন পার্টিকেল রূপে দেখতে পাই যেমন ইলেকট্রন, ওয়ার্ড, মিউন, হিক্সবজন ইত্যাদি।

কিন্তু এখানে সমস্যা হচ্ছে, লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারের পার্টিকেল ডিটেক্টর হিক্সবজন ডিটেক্ট করতে পারে না, কারণ হিক্সবজনের আয়ু খুবই কম, টেন টু দাপট মাইনাস টুয়েন্টি টু সেকেন্ড। ফলে পার্টিকেল ডিটেক্টর হিক্সবজন ডিটেক্ট করার আগেই এই হিক্সবজন অন্য পার্টিকেলের রূপান্তর হয়ে যায়। অর্থাৎ হিক্সবজন ডিকের মাধ্যমে অন্য পার্টিকেলের রূপান্তর হয়ে যায়।

তাহলে এই ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন সামনে আসে, হিক্সবজন যদি ডিটেক্ট করা সম্ভবই না হয়, তবে আমরা কিভাবে বলতে পারি যে হিক্সবজন রয়েছে? আসলে এই ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা হয়, হিক্সবজন ডিকের মাধ্যমে কিসের উপান্তর হয়। হিক্সবজন ডিকের মাধ্যমে বিভিন্ন পার্টিকেল তৈরি করতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা মূলত হিক্সবজনের দিকে থেকে উপুণ্য ফোটনের দিকে ফোকাস করেন। সাধারণত একটি হিক্সবজন ডিকের মাধ্যমে দুইটি ফোটন তৈরি করবে।

কিন্তু এই ক্ষেত্রেও সমস্যা রয়েছে, কারণ পার্টিকেল ডিটেক্টরে সংঘর্ষের ফলে প্রচুর পরিমাণ ফোটন উৎপন্ন হয়। এই অসংখ্য ফোটনের মধ্যে কোন দুইটি ফোটন হিক্সবজন থেকে উৎপন্ন হয়েছে, তা আলাদা করে শনাক্ত করা আরেকটি কঠিন বিষয়। তবে এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা অবশ্য শক্তির নিত্যতা বিষয়টি লক্ষ্য করেন।

মনে করুন সংঘর্ষের ফলে একটি হিক্সবজন উৎপন্ন হয়েছে, তাহলে এর শক্তি হবে E = mc², এখানে m হচ্ছে হিক্সবজনের ভর। এখন সাধারণভাবে হিক্সবজন ডিকের মাধ্যমে যদি ফোটন তৈরি করে, সেক্ষেত্রে দুইটি ফোটন তৈরি হবে এবং এদের গতিপথ হবে বিপরীত দিকে। তাহলে হিক্সবজন ডিকের মাধ্যমে পরবর্তীতে যে ফোটন তৈরি হচ্ছে, তাদের শক্তি হবে প্রথম ফোটনের মোট শক্তি প্লাস দ্বিতীয় ফোটনের মোট শক্তি, অর্থাৎ E = Ek₁ + Ek₂ + mc² + Ek₁ + Ek₂।

এখানে Ek₁ হচ্ছে প্রথম ফোটনের গতিশক্তি এবং Ek₂ হচ্ছে দ্বিতীয় ফোটনের গতিশক্তি। এখন আমরা জানি ফোটনের ভর শূন্য, ফলে সমীকরণটি দাঁড়ায় E = Ek₁ + Ek₂। অর্থাৎ দুইটি ফোটনের মোট শক্তি হচ্ছে প্রথম ফোটনের গতিশক্তি প্লাস দ্বিতীয় ফোটনের গতিশক্তি।

তাহলে ভরের নিত্যতার সূত্র অনুযায়ী ডিকের আগে এবং ডিকের পরে মোট শক্তি সমান থাকবে, অতএব E = Ek₁ + Ek₂ = mc² = Ek₁ + Ek₂। এখানে Ek₁ এবং Ek₂ পরস্পর সমান হবে কারণ এই দুইটি হচ্ছে ফোটন। অতএব Ek₁ = Ek₂। Ek₁ এবং Ek₂ সমান বিধায় আমরা লিখতে পারি Ek₁ = ½ mc² এবং Ek₂ = ½ mc²।

এলএইচসির পার্টিকেল ডিটেক্টর মূলত এমন দুইটি ফোটন থাকে যাদের গতিপথ পরস্পরের বিপরীত এবং যাদের গতিশক্তি হিক্সবজনের ভরের ১/২। যদি এমন দুইটি ফোটন পাওয়া যায়, যাদের গতিপথ পরস্পরের বিপরীত হবে এবং প্রত্যেকটি ফোটনের গতিশক্তি হিক্সবজনের ভরের ১/২ হবে, তবে আমরা বলতে পারব যে হিক্সবজন উৎপন্ন হয়েছিলো। তবে এখানেও সমস্যা রয়েছে। এ বিষয়টি তখনই প্রযোজ্য হবে যদি হিক্সবজন স্থিতিশীল বা রেস্ট অবস্থায় উৎপন্ন হয়, অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে হিক্সবজনের মোমেন্টাম ০ হতে হবে।

কিন্তু বাস্তবে হিক্সবজনে সবসময় কিছুটা মোমেন্টাম উপস্থিত থাকবে এবং এই সমস্যার সমাধান করা হয় রেফারেন্স ফ্রেম বিবেচনা করে। এবং সেই ক্ষেত্রে সূত্রটি দাঁড়ায়—যাইহোক মুদ্দা কথা হচ্ছে, দুইটি ফোটনের মোট শক্তি যদি হিক্সবজনের ভরের সমান হয় এবং ফোটন দুইটির গতিপথ যদি বিপরীতমুখী হয়, তবেই আমরা বলতে পারব যে হিক্সবজন উৎপন্ন হয়েছিল।

এখানে আরেকটি প্রশ্ন থাকে—দুইটি প্রটনের সংঘর্ষের ফলে অসংখ্য ফোটন উৎপন্ন হবে। এদের মধ্যে যেকোনো দুইটি ফোটনের মোট শক্তি হিক্সবজনের ভরের সমান হতেই পারে। সেক্ষেত্রে আমরা কিভাবে নিশ্চিত হব যে যেই ফোটন দুইটি আমরা বিবেচনা করছি তারা হিক্সবজন থেকেই উৎপন্ন হয়েছে? তাছাড়া হিক্সবজনের ভর কত সেটাও তো আমরা জানি না।

এক্ষেত্রে সাহায্য নেওয়া হয় পরিসংখ্যানের এবং ম্যাথমেটিক্সের মাধ্যমে হিক্সবজনের আনুমানিক ভর জানা রয়েছে। যাইহোক এখানে পরিসংখ্যান যেভাবে কাজে লাগানো হয় তা হচ্ছে—ব্রোটনের মাধ্যমে সংঘটিত কোটি কোটি সংঘর্ষের ফলে যে সকল ফোটন পেয়ার উৎপন্ন হয়, সেই সকল ফোটনের শক্তি সংরক্ষিত হয়। এখন যদি সত্যিকার অর্থে হিক্সবজন থাকে এবং তা থেকে ফোটন নির্গত হয়, তবে সকল ডাটা গ্রাফে বসালে হিক্সবজনের জন্য একটি পিক বা উঁচু অংশ পাওয়া যাবে।

এই গ্রাফে রয়েছে কয়েক বছরের সংঘটিত কোটি কোটি সংঘর্ষের ডাটা। গ্রাফটিতে লক্ষ্য করলে দেখবেন এই অংশে একটি পিক রয়েছে, যা হিক্সবজনের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। আরেকটি বিষয়, ফোটন ছাড়াও হিক্সবজন ডিকের মাধ্যমে অন্য সকল পার্টিকেলেও রূপান্তর হতে পারে এবং বিজ্ঞানীরা সেই সমস্ত ডাটাগুলোকেও লিপিবদ্ধ করেন। এবং সেই সকল ডাটার ক্ষেত্রেও একশো পঁচিশ গিগাআইভিএ ট্রাবল্ড অংশে গিয়ে পিক পাওয়া গিয়েছে।

সুতরাং হিক্সবজন বা গডপার্টিকেল ইতিহাস। এখন একটি প্রশ্ন আপনার মনে আসতে পারে—হিক্সবজন বা গডপার্টিকেলের নিজস্ব ভর হচ্ছে প্রায় ১২৫ গিগাআইভিএ ট্রু বা ডি বোর্ড বাই সেকেন্ড। এই হিক্সবজন বা গডপার্টিকেলের ভর কোথা থেকে আসে? হিক্সবজন বা গডপার্টিকেলের ভর আসে হিক্সফিল্ড থেকেই। হিক্সফিল্ড অন্য সকল ফিল্ড থেকে কিছুটা আলাদা।

অন্যান্য পার্টিকেল যেমন ইলেকট্রনের জন্য একটি ফিল্ড রয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে ইলেকট্রন ফিল্ড। এখন এই ইলেকট্রন ফিল্ডের যে স্থানে ১ কুইন্টেস্টেট স্টেট থাকবে বা ওয়েব থাকবে, সেটিকে আমরা ইলেকট্রন বলবো। এবং ইলেকট্রন ফিল্ডের যে স্থানে ওয়েব থাকবে না সেখানে ভ্যালু হবে ০। কিন্তু হিক্সফিল্ডের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয় হিক্সফিল্ডের সকল স্থানে ১ সাইডেশন বা ওয়েব থাকে, অর্থাৎ হিক্সফিল্ডের ভ্যালু কখনোই ০ হয় না। এখন হিক্সফিল্ডে স্বাভাবিক অবস্থায় এই যে এই ওয়েব দেখা যাচ্ছে, এগুলোকে অবশ্যই হিক্সবজন বলা যাবে না।

হিক্সফিল্ডে যদি এক্সট্রা এক্সাইটেশন স্টেট তৈরি হয়, তবে সেটিকে হিক্সবজন বা গড পার্টিকেল বলা হবে। ফলে হিক্সবজন উৎপন্ন হওয়ার পরপরই হিক্সফিল্ডের সাথে ইন্টারঅ্যাক্ট করতে শুরু করে, যার ফলে হিক্সবজন ভরপ্রাপ্ত হয়।

কোন একটি বস্তুর সবচেয়ে ছোট অংশ হচ্ছে ফান্ডামেন্টাল পার্টিকেল। এই সকল ফান্ডামেন্টাল পার্টিকেলগুলোকে একটি চার্টে এলিপিবদ্ধ করা হয়েছে, যাকে বলে স্ট্যান্ডার্ড মডেল অফ এলিমেন্টারি পার্টিকেলস। এই স্ট্যান্ডার্ড মডেল অফ এলিমেন্টারি পার্টিকেলস সম্পর্কে জানতে এই ভিডিওটি দেখতে পারেন।

Share: 

No comments yet! You be the first to comment.

মতামত, পরামর্শ বা অভিযোগ জানান!

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি