Homeসহজ বিজ্ঞাননিউট্রিনো বা গোস্ট পার্টিকেল বা ভুতুড়ে কণা – Ghost Particle Neutrino

নিউট্রিনো বা গোস্ট পার্টিকেল বা ভুতুড়ে কণা – Ghost Particle Neutrino

প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটি নিউট্রিনো আমাদের শরীরকে অতিক্রম করছে, কিন্তু আমরা তা বুঝতে পারছি না। কারণ নিউট্রিনো বলতে গেলে কোনো কিছুর সাথে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। পরমাণুর সাথে নিউট্রিনোর ইন্টারেকশন ঘটার বিষয়টি খুবই দুর্লভ।

সাধারণভাবে আলোর ফোটন আমাদের শরীরে পড়লে বাধা প্রাপ্ত হয়, ফলে আমরা ছায়া দেখতে পাই। যার ফলে খুব সহজেই ফোটনের উপস্থিতি বোঝা যায় বা ডিটেক্ট করা যায়। কিন্তু নিউট্রিনোর আচরণ একদমই ভিন্ন। এটি বলতে গেলে কোনো কিছুতেই বাধা প্রাপ্ত হয় না।

নিউট্রিনো বা গোস্ট পার্টিকেল

দৃশ্যমান বস্তুর কথা বাদই দিন, নিউট্রিনো ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স, এমনকি স্ট্রং নিউক্লিয়ার ফোর্স দ্বারাও প্রভাবিত হয় না। যার ফলে নিউট্রিনো ডিটেক্ট করা খুবই কঠিন। আপনি একটি নিউট্রিনো নিক্ষেপ করে যদি এর সামনে ওয়ান লাইট ইয়ার প্রস্থের একটি সীসার প্রাচীর রাখেন, তবে নিউট্রিনোটির এই সীসার প্রাচীরের সাথে প্রতিক্রিয়া দেখানোর সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি।

অর্থাৎ নিউট্রিনোটির বিনা বাধায় সীসার ওয়ান লাইট ইয়ার প্রস্থের প্রাচীর ভেদ করতে পারার সম্ভাবনা পঞ্চাশ শতাংশ। এবং এই জন্যই নিউট্রিনোকে ‘ঘোস্ট পার্টিকেল’ বলা হয়। আমাদের চারপাশে অসংখ্য নিউট্রিনো চলাফেরা করছে, আমাদের শরীরকে ভেদ করে এপাশ থেকে ওপাশে চলে যাচ্ছে।

কিন্তু আমরা এদের দেখতে পাচ্ছি না, এমনকি খুব সহজে এদেরকে ডিটেক্টও করা যায় না। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে বিশাল বিশাল নিউট্রিনো ডিটেক্টর স্থাপন করা হয়েছে এবং হচ্ছে, যেন বেশি সংখ্যক নিউট্রিনো ডিটেক্ট করা যায় এবং নিউট্রিনো নিয়ে বেশি স্টাডি করা যায়।

কারণ নিউট্রিনো সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে পারলে মৌলিক অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে। যেমন, বিগ ব্যাং-এর পর সমান পরিমাণ ম্যাটার এবং অ্যান্টি-ম্যাটার তৈরি হয়েছে, তবে বর্তমানে কেন আমরা শুধুমাত্র ম্যাটার দেখতে পাই?

তাছাড়া এখন পর্যন্ত মানুষ যেসব মৌলিক কণিকা সম্পর্কে জেনেছে, এদের মাধ্যমে মহাবিশ্বের মাত্র ফাইভ পার্সেন্ট ব্যাখ্যা করা যায়। বাকি নাইটি-ফাইভ পার্সেন্ট অর্থাৎ ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জি ইত্যাদি সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে নিউট্রিনো নতুন দ্বার উন্মোচিত করতে পারে।

নিউট্রিনো সম্পর্কে বলতে গেলে অনেকটা পেছন থেকে শুরু করতে হবে। ১৯ শতকের শুরুর দিকে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, পরমাণু গঠিত হয় প্রোটন এবং ইলেকট্রনের মাধ্যমে, যেখানে প্রোটন পরমাণুর কেন্দ্রীয় অবস্থান করে।

এবং এই কেন্দ্র পরমাণুর তুলনায় খুবই খুবই ছোট। তখনকার বিজ্ঞানীরা একপ্রকার নিশ্চিত ছিলেন যে, যেকোনো বস্তুর ক্ষুদ্রতম একক হচ্ছে ইলেকট্রন এবং প্রোটন। কিন্তু কিছু ভারী মৌলের আচরণ এই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিজ্ঞানীরা দেখতে পান ভারী মৌলের পরমাণু সতর্কভাবে পরিবর্তিত হয় এবং তা থেকে ইলেকট্রন নির্গত হয়। ভারী মৌলের পরমাণুর এইরকম আচরণ তখনকার সময় নানা প্রশ্ন তৈরি করে। তারা দেখতে পান, পরমাণু থেকেই ইলেকট্রন নির্গত হওয়ার বিষয়টি শক্তির সংরক্ষণশীলতার নীতি লঙ্ঘন করছে।

শক্তির সংরক্ষণশীলতার নীতি অনুযায়ী, যেকোনো ঘটনার আগে এবং পরে মোট শক্তি সমান থাকবে। অর্থাৎ শক্তি নতুন করে সৃষ্টি করা যায় না, আবার ধ্বংসও করা যায় না। কিন্তু ভারী মৌলের পরমাণু থেকে ইলেকট্রন নির্গত হবার আগে এবং পরে মোট শক্তি হিসেব করে বিজ্ঞানীরা দেখেন কিছু শক্তি হারিয়ে যাচ্ছে।

তখন আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল, এই ঘটনা যেন পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক নীতিকে লঙ্ঘন করছে। এমন সময় সামনে আসেন ওলফগ্যাং পাউলি। তিনি প্রস্তাব করেন, এখানে এমন এক ধরনের পার্টিকেল রয়েছে যা মানুষ কখনো দেখেনি, এমনকি ডিটেক্ট করতেও পারেনি।

তিনি বলেন, ভারী মৌলের পরমাণু থেকে শুধুমাত্র ইলেকট্রন নির্গত হয় না, এর সাথে অজানা এক ধরনের পার্টিকেল নির্গত হয়, যা আমরা দেখি না কিংবা ডিটেক্ট করতে পারি না। এই অজানা পার্টিকেলটি মিসিং বা হারিয়ে যাওয়া এনার্জি বহন করে এবং সেই অজানা পার্টিকেল ডিটেক্ট করতে পারলে দেখা যাবে শক্তির সংরক্ষণশীলতার নীতি লঙ্ঘন হচ্ছে না।

পাউলির এই প্রস্তাব থেকেই কালক্রমে সামনে আসে নিউট্রিনো। বর্তমানে আমরা জানি, ভারী মৌলের পরমাণু থেকে ইলেকট্রন নির্গত হওয়ার বিষয়টি হচ্ছে রেডিওঅ্যাকটিভিটি, বিশেষ করে বিটা মাইনাস ক্ষয়, যেখানে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে থাকা নিউট্রন প্রোটনে রূপান্তরিত হয় এবং সেই সাথে ইলেকট্রন এবং অ্যান্টি-নিউট্রিনো নির্গত করে।

কিন্তু সেই সময় পাউলির প্রস্তাব করা অজানা পার্টিকেলের বিষয়টি অনেকেই সমর্থন করতে চাননি। তবে কিছু বিজ্ঞানী বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন এনরিকো ফার্মি।

তিনি এমন পার্টিকেল খোঁজার চেষ্টা করতে থাকেন যার মধ্যে চার্জ নেই, যেটি ইলেকট্রন থেকে বহুগুণে ছোট এবং যা পরমাণুর পাশ দিয়ে যাবার সময় এমন আচরণ করে যেন তার সামনে কিছুই নেই। ফার্মি প্রথম এমন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পার্টিকেলের নাম দেন নিউট্রিনো এবং এর মাধ্যমে শুরু হয় নিউট্রিনো হান্টিং।

বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, পরমাণু ভাঙ্গনের ফলে যদি নিয়মিত নিউট্রিনো নির্গত হয় তবে নিউট্রিনো ডিটেক্ট করার জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশ হবে পারমাণবিক বোমা। কারণ পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ফলে প্রচুর পরিমাণে পরমাণুর ভাঙ্গন সংঘটিত হয়, ফলে সেখান থেকে প্রচুর পরিমাণ নিউট্রিনো নির্গত হবে।

১৯৫১ সালে ফ্রেডরিক রেইনস এবং তার সহকর্মী ক্লাইড কাওয়ান পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে যে নিউট্রিনো নির্গত হবে তা ডিটেক্ট করার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেই অনুযায়ী একটি মডেল তৈরি করেন। মডেল অনুযায়ী নিউট্রিনো ডিটেক্টর বসানো হবে বোমা বিস্ফোরণের স্থানে, তবে তা হবে মাটির ১৫০ ফুট নিচে।

কিন্তু এরকম পরীক্ষা বাস্তবসম্মত ছিল না, ফলে তারা ভিন্ন কিছু ভাবতে থাকেন। একসময় তারা বুঝতে পারেন, পরমাণু নিউক্লিয়াস থেকে যেমনভাবে ইলেকট্রন নির্গত হচ্ছে, সেই সাথে নিউট্রিনোও নির্গত হচ্ছে। ঠিক তেমনি বিষয়টি উল্টোও ঘটতে পারে।

অর্থাৎ বিষয়টি খুব দুর্লভ হলেও, মাঝেমধ্যে নিউট্রিনো নিউক্লিয়াসের সাথে ইন্টারঅ্যাক্ট করতে পারে। আর যদি এমনটা করে তবে তা থেকে নিউট্রন এবং পজিট্রন নির্গত হবে। এবং যদি এই দুইটি পার্টিকেলকে সঠিক তরলের মধ্যে প্রবাহিত করা যায় তবে পরপর দুইটি স্বতন্ত্র লাইট ফ্ল্যাশ দেখা যাবে, যার মাধ্যমে নিউট্রিনোর উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এক্ষেত্রে বিষয়টি হচ্ছে, একটি নিউট্রিনো প্রোটনের সাথে যুক্ত হয়ে নিউট্রন এবং পজিট্রন তৈরি করবে। এবং এই নিউট্রন এবং পজিট্রনের ফলে আলাদাভাবে দুটি লাইট ফ্ল্যাশ দেখা যাবে। যাইহোক, সে অনুযায়ী রেইনস এবং কাওয়ান একটি ডিটেক্টর তৈরি করেন, যেটি ছিল একটি ট্যাঙ্কের মত। ট্যাঙ্কটি তরল দ্বারা পূর্ণ ছিল এবং ট্যাঙ্কের চারপাশে লাইট সেন্সর বসানো ছিল।

তারা এ ডিটেক্টর স্থাপন করেন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে। ডিটেক্টর বসানোর প্রায় ৫ বছর পর, অর্থাৎ ১৯৫৬ সালে, তারা প্রথম নিউট্রিনো ডিটেক্ট করতে সমর্থ হন। এর মাধ্যমে পাওলি অনুমান করা অদৃশ্য রহস্যময় পার্টিকেল প্রায় ২০ বছর পর সত্য হিসেবে সবার সামনে উন্মোচিত হয়।

এই অসামান্য কাজের জন্য ৪০ বছর পর, অর্থাৎ ১৯৯৫ সালে, ফ্রেডরিক রেইনসকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, সেই সময়ে ফ্রেডরিক রেইনসের সহকর্মী কাওয়ান জীবিত ছিলেন না। যাইহোক, এরপর থেকে নিউট্রিনো নিয়ে বিস্তর গবেষণা শুরু হয়।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিউক্লিয়ার ফিশন বিক্রিয়া সংঘটিত হয়, অর্থাৎ ভারী মৌল ভেঙে অপেক্ষাকৃত হালকা মৌলে পরিণত হয় এবং সেই সাথে নিউট্রিনো নির্গত হয়। সেইক্ষেত্রে সূর্য থেকেও নিউট্রিনো নির্গত হবে, কারণ সূর্যে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া সংঘটিত হয়।

সেখানে ছোট পরমাণু পরস্পরের সাথে যুক্ত হয়ে অপেক্ষাকৃত বড় পরমাণু তৈরি করে, ফলে সেখান থেকেও নিউট্রিনো নির্গত হবে। এখন সূর্য থেকে আসা নিউট্রিনো সম্পর্কে যদি জানা যায় তবে সূর্য সম্পর্কেও অনেক কিছু জানা যাবে।

এই উদ্দেশ্যে ১৯৬৫ সালে রেমন্ড ডেভিস একটি খনির গভীরে ডিটেক্টর স্থাপন করেন। মাটির অনেক গভীরে ডিটেক্টর স্থাপন করার কারণ হচ্ছে, কসমিক রশ্মির ফলে পরীক্ষার ফলাফল যেন প্রভাবিত না হয়। ডেভিস বিশাল আকৃতির একটি স্টিলের ট্যাঙ্ক তৈরি করেন যেটিকে প্রায় ৪০০,০০০ লিটার পিওর ক্লোরিন দ্বারা পূর্ণ করা হয়।

এখন সূর্য থেকে আসা নিউট্রিনো যদি এই ট্যাঙ্কে থাকা ক্লোরিনের সাথে ইন্টারঅ্যাক্ট করে, তবে ক্লোরিনের ওই পরমাণুটি রেডিওএকটিভ আরগনে পরিণত হবে, যা থেকে নিউট্রিনো ডিটেক্ট করা যাবে। বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেন, প্রতি মিনিটে প্রায় মিলিয়ন ট্রিলিয়ন নিউট্রিনো এই ট্যাঙ্কে থাকা ক্লোরিনকে অতিক্রম করবে।

কিন্তু এই নিউট্রিনো ক্লোরিনের সাথে ইন্টারঅ্যাক্ট করার সম্ভাবনা খুবই কম। ডেভিস প্রতি সপ্তাহে মাত্র দশটি নিউট্রিনো এবং ক্লোরিন ইন্টারঅ্যাকশন ঘটবে বলে আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু দেখা গেল, থিওরি অনুযায়ী যতগুলো নিউট্রিনো ডিটেক্ট হওয়ার কথা, তার মাত্র ৩ ভাগের ১ ভাগ নিউট্রিনো ডিটেক্ট হচ্ছে।

নিউট্রিনোর এরকম রহস্যময় আচরণ নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়, যাকে বলে সোলার নিউট্রিনো প্রবলেম। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে ব্রুনো পন্টেকোরভ নিউট্রিনোর এই রহস্যময় আচরণ সম্পর্কে বলেন, হয়তো নিউট্রিনো ১ ধরনের নয়, হতে পারে ২ বা ৩ ধরনের। বর্তমানে আমরা জানি, নিউট্রিনো ৩ ধরনের।

যাদেরকে নিউট্রিনো ফ্লেভার বলা হয় এবং এদেরকে যথাক্রমে ইলেকট্রিক নিউট্রিনো, মিউন নিউট্রিনো এবং টাও নিউট্রিনো বলা হয়। যাই হোক, পণ্ডিতবাবু আরো বলেন নিউট্রিনো সৃষ্টির সময় একটি নির্দিষ্ট ফ্লেভার নিয়ে সৃষ্টি হয়, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে নিউট্রিনো তার ফ্লেভার চেঞ্জ করতে পারে, যাকে বলে নিউট্রিনো অসিলিয়েশন। বিষয়টি অনেকটা এমন যে আমি সময়ের সাথে সাথে তিনটি ভিন্ন আইডেন্টিটি ধারণ করতে পারার মত। স্বাভাবিকভাবে এমনটা ভাবা কঠিন, কিন্তু পণ্ডিতবাবু বললেন নিউট্রিনোর ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটতে পারে।

নিউট্রিনোর এমন ফ্লেভার চেঞ্জ করার বিষয়টি যদি সঠিক হয়, তবে রেডিবিসের ডিটেক্টর কেন ৩ ভাগের ১ ভাগ নিউট্রিনো ডিটেক্ট করছিল তার একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় স্ট্যান্ডার্ড মডেল অফ এলিমেন্টারি পার্টিকলস। কারণ স্ট্যান্ডার্ড মডেলের প্রেডিকশন অনুযায়ী নিউট্রিনো হবে ভরহীন, অর্থাৎ নিউট্রিনোতে ভর থাকবে না। এখন নিউট্রিনো যদি ভরহীন হয়, তবে নিউট্রিনোর ক্ষেত্রে অসিলিয়েশন ঘটা সম্ভব নয়।

কারণ আলবার্ট আইনস্টাইনের রিলেটিভিটির অনুযায়ী কোন বস্তু যদি আলোর বেগে গতিশীল হয়, তবে তার জন্য সময় স্থির হয়ে যাবে, অর্থাৎ ওই বস্তু সময় বলতে কিছু এক্সপেরিয়েন্স করবে না। এখন স্ট্যান্ডার্ড মডেলের প্রেডিকশন অনুযায়ী নিউট্রিনো যদি ভরহীন হয়, তবে নিউট্রিনো আলোর গতিতে চলবে। কারণ ভরহীন বস্তু সব সময় আলোর গতিতে চলে। সেক্ষেত্রে নিউট্রিনোর জন্য সময় স্থির হয়ে যাবে। অর্থাৎ নিউট্রিনো সময় বলতে কিছুই এক্সপেরিয়েন্স করবে না, আর সময় এক্সপেরিয়েন্স না করতে পারলে সেক্ষেত্রে অসিলিয়েশনও ঘটতে পারে না। ফলে তখন স্ট্যান্ডার্ড মডেল এবং রেডিবিসের প্রাপ্ত ফলাফল অসমাপ্তই থেকে যায়।

কিন্তু রেডিবিস তাদের গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে জাপানে একটি অত্যাধুনিক নিউট্রিনো ডিটেক্টর স্থাপন করা হয়, যাকে বলে সুপার কামিওকান্ডে। এটি মাটির গভীরে স্থাপন করা হয় যেখানে ১১,০০০ লাইট বাক্স ব্যবহার করা হয়েছে। এই লাইট বাল্বগুলো কিছুটা ভিন্ন ধরনের। সাধারণ লাইট বিদ্যুতের মাধ্যমে আলো উৎপন্ন করে, কিন্তু সুপারে ব্যবহৃত এসব লাইট বিপরীতভাবে কাজ করে, অর্থাৎ এরা আলো শোষণ করে এবং এর মাধ্যমে ইলেকট্রিক সিগন্যাল তৈরি করে।

লাইট বাল্বের পাশাপাশি সুপারে ব্যবহার করা হয়েছে ১০০% বিশুদ্ধ পানি, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০,০০০ টন। নিউট্রিনো যখন এই পানির পরমাণুর সাথে ইন্টারঅ্যাক্ট করে, তখন তা থেকে আলোর ঝলকানি তৈরি হয়। ওই আলো লাইট বাল্ব শোষণ করে এবং এর মাধ্যমে নিউট্রিনোর গতিপথ ও প্রকৃতি জানা যায়। সুপার কামিওকান্ডের ২ বছরের গবেষণা সোলার নিউট্রিনোর সমস্যা, রেডিবিসের কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া এবং নিউট্রিনো অসিলিয়েশন – এই অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান করে।

তারা দেখতে পান, নিউট্রিনো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার পর সময়ের সাথে সাথে তাদের ফ্লেভার চেঞ্জ করে। সুতরাং নিউট্রিনো ভরহীন নয়, নিউট্রিনোতে ভর রয়েছে, তবে সেটা খুবই সামান্য। সেই সাথে তারা দেখতে পান, রেডিবিসের ডিটেক্টরের ৩ ভাগের ১ ভাগ নিউট্রিনো ডিটেক্ট হবার কারণ হচ্ছে নিউট্রিনো অসিলিয়েশন। রেডিবিসের ডিটেক্টর এমনভাবে তৈরি ছিল, যা শুধুমাত্র ১ ধরণের নিউট্রিনো ডিটেক্ট করতে সক্ষম ছিল। যার ফলে রেডিবিসের ডিটেক্টর যতটা নিউট্রিনো ডিটেক্ট করার কথা ছিল, তার তিন ভাগের এক ভাগ ডিটেক্ট করছিল – এবং সেগুলো ছিল শুধুমাত্র ইলেকট্রিক নিউট্রিনো।

এবং এর মাধ্যমে রেডিবিস তার গবেষণা শুরু করার ৩৭ বছর পর, অর্থাৎ ২০০২ সালে নোবেল পুরস্কার পান। এখানে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, যার থিওরি শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছিল, সেই পণ্ডিত তা দেখে যেতে পারেননি। কিন্তু এরপরেও একটি গভীর প্রশ্ন রয়ে গেছে। মানুষের তৈরি করা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ওয়েল-ডিফাইনড গাণিতিক থিওরি হচ্ছে এই স্ট্যান্ডার্ড মডেল। এই স্ট্যান্ডার্ড মডেলের প্রেডিকশন অনুযায়ী ২০১২ সালে হিগস বোসন বা গড পার্টিকেল শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।

কিন্তু এই স্ট্যান্ডার্ড মডেল এটা বর্ণনা করতে পারছে না যে কেন নিউট্রিনোতে ভর রয়েছে, কেন নিউট্রিনোতে অসিলিয়েশন দেখা যায়। সুতরাং এখান থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে স্ট্যান্ডার্ড মডেল এখনো অসম্পূর্ণ। বর্তমানে নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, কারণ নিউট্রিনো সম্পর্কে যত বেশি জানা যাবে, ততই প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে।

এবং নিউট্রিনো মহাবিশ্বের অনেক গভীর প্রশ্নের উত্তর হতে পারে। যার ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বিশাল বিশাল নিউট্রিনো ডিটেক্টর স্থাপন করা হচ্ছে। যেমন আন্টার্কটিকায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিউট্রিনো ডিটেক্টর স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বরফ ছিদ্র করে ৫০০০ সেন্সর বসানো হয়েছে, যাকে বলে আইসকিউব।

সুপারকের মতোই আইসকিউব নিউট্রিনোর ইন্টারঅ্যাকশনের ফলে সৃষ্ট আলোর ডিটেক্ট করবে। তবে সুপারকের সাথে আইসকিউবের ভিন্নতা হচ্ছে, আইসকিউব ডিটেক্টরের মাধ্যমে নিউট্রিনোর কসমিক অরিজিন সম্পর্কে জানা যাবে। সুতরাং আইসকিউবকে নিউট্রিনো টেলিস্কোপও বলা যেতে পারে।

ইতিমধ্যে আইসকিউব বিলিয়ন লাইট ইয়ার দূর থেকে আসা নিউট্রিনো ডিটেক্ট করতে সক্ষম হয়েছে, যেগুলো এসেছে অনেক অনেক দূরের গ্যালাক্সি থেকে। বর্তমানে ফার্মিল্যাবে আরেকটি অত্যাধুনিক নিউট্রিনো ডিটেক্টর তৈরি করা হচ্ছে, যা ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে।

ফার্মিল্যাব গত ২০ বছর যাবৎ পার্টিকেল ফিজিক্সের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করছে। পার্টিকেল ফিজিক্সেরই একটি অংশ হচ্ছে নিউট্রিনো। এই নিউট্রিনো নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ফার্মিল্যাবের গবেষকরা একটি বিষয় লক্ষ্য করেন।

থিওরি অনুযায়ী অল্প দূরত্ব অতিক্রম করার ক্ষেত্রে নিউট্রিনোতে অসিলেশন ঘটবে না বা ফ্লেভার চেঞ্জ হবে না। কিন্তু ফার্মিল্যাবের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে মাত্র ৫০০ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করার ক্ষেত্রেই নিউট্রিনো তাদের ফ্লেভার পরিবর্তন করছে।

ফার্মিল্যাবে নিউট্রন টাইপ নিউট্রিনো নিক্ষেপ করার পর মাত্র ৫০০ মিটার দূরে থাকা ডিটেক্টরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণ ইলেকট্রন টাইপ নিউট্রিনো পাওয়া যাচ্ছিল। অর্থাৎ থিওরিতে পূর্বে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কম সময়ের মধ্যে নিউট্রিনোর মধ্যে অসিলেশন ঘটছে। এটি খুবই অদ্ভুত বিষয়।

ফলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, হয়তোবা চতুর্থ কোনো এক ধরনের নিউট্রিনো রয়েছে, যার প্রভাবে নিয়ন নিউট্রিনো স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে ফ্লেভার পরিবর্তন করছে। এই চতুর্থ ধরনের নিউট্রিনোর নাম দেওয়া হয় স্টার্লার নিউট্রিনো।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই স্টার্লার নিউট্রিনো হয়তো সাধারণ নিউট্রিনোর চেয়েও বেশি নিষ্ক্রিয়, অর্থাৎ ম্যাটারের সাথে একদমই ইন্টারঅ্যাক্ট করে না। ফলে এই স্টার্লার নিউট্রিনো হয়তো ডিটেক্ট করা সম্ভব হবে না, তবে স্টার্লার নিউট্রিনোর ফলে সৃষ্ট ইফেক্টের মাধ্যমে এদের উপস্থিতি বোঝা যাবে।

অর্থাৎ স্টার্লার নিউট্রিনো হতে পারে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের মিসিং অংশের একটি পার্টিকেল। যদি এমনটাই হয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো ডার্ক এনার্জি এবং ডার্ক ম্যাটার ব্যাখ্যা করা যায় এমন পার্টিকেলগুলো সম্পর্কে জানা যাবে।

তাদের যদিও সরাসরি দেখা যাবে না বা ডিটেক্ট করা যাবে না, তবে এদের ইফেক্টের মাধ্যমে এদের উপস্থিতি বোঝা যাবে। তবে এই ক্ষেত্রে আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হবে। সময়ই সব কিছুর উত্তর সামনে নিয়ে আসবে।

নিউট্রিনোর মতোই আরেকটি চমৎকার পার্টিকেল হচ্ছে গড পার্টিকেল। ২০১২ সালে কিভাবে গড পার্টিকেল শনাক্ত করা হয়েছিল এবং গড পার্টিকেল বা হিগস বোসন কিভাবে কাজ করে তা জানতে এই ভিডিওটি দেখতে পারেন। ভিডিও ভালো লাগলে বিজ্ঞান পাইসি পরিবারে যুক্ত হয়ে সাথে থাকতে পারেন।

Share: 

No comments yet! You be the first to comment.

মতামত, পরামর্শ বা অভিযোগ জানান!

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি