Homeসহজ বিজ্ঞানদৈর্ঘ্য সংকোচন, মিউয়ন এবং মই প্যারাডক্স – Length Contraction, Muon and Ladder paradox

দৈর্ঘ্য সংকোচন, মিউয়ন এবং মই প্যারাডক্স – Length Contraction, Muon and Ladder paradox

দৈর্ঘ্য সংকোচন, মিউয়ন এবং মই প্যারাডক্স Length Contraction, Muon and Ladder paradox

আপনার যদি দৈর্ঘ্য সংকোচন, মিউয়ন এবং মই প্যারাডক্স Length Contraction, Muon & Ladder paradox নিয়ে জানার আগ্রহ থাকলে তাহলে এই আর্টিকেল আপনারই জন্য। সহজভাষা আলোচনা করবো কীভাবে দৈর্ঘ্য সংকোচন কাজ করে এবং এর গুরুত্ব কী? এছাড়াও থাকবে ব্যাখ্যা, ব্যবহার ও প্রকারভেদ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।

কোনো ব্যক্তির উচ্চতা যদি ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি হয় এর মানে, যে কোনোভাবেই তার উচ্চতা মাপা হোক না কেন, ৫ ফুট ৩ ইঞ্চিই পাওয়া যাবে। যদি কেউ সেই ব্যক্তির উচ্চতা মেপে ৪ ফুট বলে, তবে সেটাকে ভুল ছাড়া অন্য কোনোভাবে কি ব্যাখ্যা করা সম্ভব? উত্তর হচ্ছে, সম্ভব।

দৈর্ঘ্য মূলত একটি আপেক্ষিক বিষয়। গতিশীল বস্তুর ক্ষেত্রে দৈর্ঘ্য সংকোচন ঘটে, যাকে বলা হয় লেংথ কন্ট্রাকশন। যদি কোনো মানুষ পায়ের দিক কিংবা মাথার দিক বরাবর উচ্চগতিতে গতিশীল থাকে, তবে তার ক্ষেত্রে দৈর্ঘ্য সংকোচন ঘটবে। এবং এমন ক্ষেত্রে, তার সাপেক্ষে স্থির একজন ব্যক্তি তার উচ্চতা ৪ ফুট বললে সেটাকে ভুল বলার সুযোগ নেই।

এর অর্থ হচ্ছে, কোনো একটি বস্তুর দৈর্ঘ্য কেমন হবে, তা ওই বস্তুর গতির উপর নির্ভর করে। বস্তুর গতি যত বেশি হবে, তার দৈর্ঘ্য ততই ছোট হবে। এখন এই দৈর্ঘ্য সংকোচনের মাধ্যমে প্রকৃতিতে সংঘটিত একটি ঘটনা লেডার প্যারাডক্স খুব সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। আবার এই দৈর্ঘ্য সংকোচনের ফলে লেডার প্যারাডক্সের মতো বিষয় সামনে আসে।

এই আর্টিকেল দৈর্ঘ্য সংকোচন বা লেংথ কন্ট্রাকশন সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাজানো হয়েছে। এটি বিদ্যাশিখি ডট কম এর একাডেমিক বিজ্ঞান বিভাগের নিয়মিত আয়োজন। নিয়মিত আপডেট পেতে সকল প্লাটফর্মে আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন।

দৈর্ঘ্য সংকোচন (What is length contraction?)

যেকোনো একটি বস্তুকে যত দূরে নেওয়া হয়, তাকে ততই ছোট দেখা যাবে। অনেকেই এটাকে দৈর্ঘ্য সংকোচন ভাবেন। কিন্তু আসলে এটা দৈর্ঘ্য সংকোচন নয়, এমনটা জাস্ট চোখের দৃষ্টিকোণের জন্য ঘটে।

দৈর্ঘ্য সংকোচন শুধুমাত্র বস্তুর গতির দিক বরাবর ঘটে। অর্থাৎ, আপনি যদি ডান থেকে বাম দিকে গতিশীল থাকেন, তবে আপনার দৈর্ঘ্য সংকোচন এইভাবে ঘটবে, যার ফলে আপনাকে চিকন দেখাবে। আবার যদি নিচ থেকে উপরের দিকে গতিশীল থাকেন, তবে দৈর্ঘ্য সংকোচনের বিষয়টি সেই দিকেই ঘটবে।

অনেকেই ভাবতে পারেন, এই বিষয়টি শুধুমাত্র দৃষ্টি বিভ্রম। অর্থাৎ, কোনো একটি বস্তু যদি উচ্চগতিতে গতিশীল থাকে, তবে তা ক্যাপচার করার জন্য আমাদের চোখ যথেষ্ট সময় পাবে না, ফলে বস্তুটিকে ছোট দেখাবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- না, দৈর্ঘ্য সংকোচন কোনো প্রকার দৃষ্টি বিভ্রম নয়। প্রকৃত অর্থেই বস্তুর দৈর্ঘ্য সংকোচন ঘটে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বস্তুর দৈর্ঘ্য সংকোচন কিভাবে ঘটে? এর উত্তর বুঝতে হলে প্রথমে একটি বিষয় মাথায় নিতে হবে, আর তা হচ্ছে- যে কোনো পর্যবেক্ষণের সাপেক্ষে আলোর বেগ সম থাকবে, অর্থাৎ ধ্রুবক।

দৈর্ঘ্য সংকোচন এর সচিত্র ব্যাখ্যা (What is length contraction?)
টর্চ লাইটের মাধ্যমে দৈর্ঘ্য সংকোচন পরীক্ষার চিত্র

যেমন মনে করুন, কোনো একটি স্পেসক্রাফট সেকেন্ডে ৫০,০০০ কিলোমিটার বেগে গতিশীল এবং স্পেসক্রাফটটিকে আপনি পৃথিবী থেকে দেখছেন। স্পেসক্রাফটের ভেতরে যদি একটি টর্চ লাইট অন করা হয়, তবে তা থেকে আলো নির্গত হবে। এখন জানার বিষয় হলো, পৃথিবী থেকে এই টর্চ লাইটের আলোর বেগ কত মনে হবে?

সাধারণ ও স্বাভাবিক উত্তর হলো- স্পেসক্রাফটের বেগ প্লাস আলোর বেগ। তাহলে খেয়াল করতে হবে, এখানে আলোর বেগ ধ্রুব থাকছে না। কিন্তু আপনি কী জানেন? তথ্য অনুযায়ী, যে কোনো অবস্থান থেকে আলোর বেগ ফিক্সড থাকবে। তার মানে, আলোর বেগ এই ফিক্সড মানের চেয়ে বাড়বেও না এমনকি কমবেও না।

আরও পড়ুনঃ জাহাজ ভাসা ও স্টেবল থাকার কৌশল

স্থানকাল বা স্পেস-টাইমে পরিবর্তন

স্থানকাল বা স্পেস-টাইমে পরিবর্তন
চিত্র: স্থানকাল বা স্পেস-টাইমে পরিবর্তন সংক্রান্ত চিত্র।

অন্যদিকে, আমাদের বিবেচনা করা পরিস্থিতিতে আলোর বেগকে বেশি মনে হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, আলোর বেগ বেশি হওয়া সম্ভব না। এবং এই বাস্তবতার নিরিখে, গতিশীল স্পেস ক্রাফটের দুই ধরনের পরিবর্তন আসবে। আর তা হচ্ছে স্থানকাল বা স্পেস-টাইমে পরিবর্তন। স্পেসের ক্ষেত্রে লেংথ কন্ট্রাকশন এবং টাইমের ক্ষেত্রে টাইম ডিলেশন। অর্থাৎ, স্পেসক্রাফটের সময় ধীর হয়ে যাবে এবং স্পেস ক্রাফটের দৈর্ঘ্য ছোট হয়ে যাবে।

এবার ভিন্ন একটি পরিস্থিতি বিবেচনা করা যাক। মনে করি, কোনো একটি স্পেসক্রাফট উচ্চগতিতে পৃথিবী থেকে বহু দূরে থাকা অন্য একটি মহাজাগতিক বস্তু B এর দিকে যাবে। এবং আরও মনে করি, v বেগে পৃথিবীর দৃষ্টিকোণ থেকে সেই বস্তুর কাছে পৌঁছাতে স্পেসক্রাফটের t সময় লেগেছে।

তাহলে পৃথিবী থেকে সেই বস্তুর দূরত্ব হবে vt = Lo অর্থাৎ, Lo​ হচ্ছে পৃথিবী এবং মহাজাগতিক বস্তুর মধ্যবর্তী দূরত্ব। এবার স্পেসক্রাফটের ভেতরে থাকা মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করুন। যেহেতু স্পেসক্রাফট উচ্চগতিতে চলছে, তাই তার সময় পৃথিবীর তুলনায় ধীর হয়ে যাবে।

দৈর্ঘ্য সংকোচন, মিউয়ন এবং মই প্যারাডক্স - Length Contraction, Muon and Ladder paradox - Space Time Change

এর মানে, স্পেসক্রাফটের নিজস্ব সময় অনুযায়ী, পৃথিবী থেকে B তে পৌছাতে T এর কম সময় প্রয়োজন হবে। ধরে নিন, পৃথিবীর দৃষ্টিকোণ থেকে সময় হচ্ছে To, আর স্পেসক্রাফটের দৃষ্টিকোণ আর পৃথিবীর দৃষ্টিকোণ থেকে বেগ v হলেও পৃথিবী থেকে B তে পৌছানোর ক্ষেত্রে সময় দুই ক্ষেত্রেই আলাদা পাওয়া যাচ্ছে। পৃথিবীর বিবেচনায় T এর স্পেসক্রাফটের বিবেচনায় To;

তাহলে প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে কম সময়ের মধ্যে সেই দূরত্ব অতিক্রম সম্ভব হলো? এর উত্তর হচ্ছে, উচ্চ গতির ফলে স্পেস ক্রাফটের দৃষ্টিতে বাইরের স্পেস সংকুচিত হয়ে যায়। অর্থাৎ, পৃথিবী এবং B বা গন্তব্য বস্তুর দূরত্ব পৃথিবীর হিসেবে Lo​ হলেও, স্পেসক্রাফটের হিসেবে তা হবে Lo এর কম। ধরে নিই L;

এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে, দুইজন পর্যবেক্ষকের কাছে দুই রকম দূরত্ব পাওয়া যাচ্ছে। এটাই হচ্ছে দৈর্ঘ্য সংকোচন বা লেংথ কন্ট্রাকশন। স্পেসক্রাফটের দৃষ্টিকোণে, তার সামনের সব কিছুই গতির দিক বরাবর সংকুচিত দেখাবে। এবং সে নিজেকে স্থির ভাববে, আর সামনের বস্তুকে মনে করবে গতিশীল। অন্যদিকে, পৃথিবী থেকে পর্যবেক্ষণে স্পেসক্রাফটকে মনে হবে গতিশীল, এবং তাই তাকেই সংকুচিত দেখা যাবে।

দৈর্ঘ্য সংকোচন, মিউয়ন এবং মই প্যারাডক্স - Length Contraction, Muon and Ladder paradox - Lenth Construction

এখানে লক্ষ্য করুন- দুইজন পর্যবেক্ষকই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সঠিক। বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে আপনি কোন অবস্থা থেকে পর্যবেক্ষণ করছেন তার ওপর। আপনি যদি পৃথিবী থেকে স্পেসক্রাফটকে সংকুচিত দেখেন, সেটি যেমন ঠিক, স্পেসক্রাফট যদি আপনাকে সংকুচিত দেখে, সেটিও ঠিক।

আরও পড়তে পারেন: কোয়ান্টাম ফিজিক্স যেভাবে উন্মোচিত হয়েছিল

দৈর্ঘ্য সংকোচনের পরিমাণ নির্ণয় ফর্মূলা (Length contraction formula)

এই সূত্র ব্যবহার করে দৈর্ঘ্য সংকোচনের পরিমাণ নির্ণয় করা যায়। এখানে L হচ্ছে সংকুচিত দৈর্ঘ্য, Lo​ হচ্ছে স্থির পর্যবেক্ষকের মতে দৈর্ঘ্য, আর V হচ্ছে স্পেসক্রাফটের বেগ এবং c হচ্ছে আলোর বেগ।

দৈর্ঘ্য সংকোচনের পরিমাণ নির্ণয় ফর্মূলা
দৈর্ঘ্য সংকোচনের পরিমাণ নির্ণয় করার সূত্র

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ১০০ মিটার দূরের কোনো একটি বস্তু যদি আলোর বেগের ৮৫% বেগে অতিক্রম করে, তবে পৃথিবী থেকে ওই বস্তুকে ৫২.৭ মিটার দেখাবে।

টাইম ডিলেশন এবং লেংথ কন্ট্রাকশনের বিষয়টি আলো, অর্থাৎ ফোটনের ক্ষেত্রে বিবেচনা করলে চমৎকার একটি বিষয় সামনে আসবে। ফোটন মানে হচ্ছে আলো। আলোর বেগের ক্ষেত্রে সময় স্থির এবং দূরত্ব হবে ০।

তার মানে ফোটনের জন্য তার গতির দিক বরাবর মহাজগতের সকল স্পেস দুর্ঘটনার মাধ্যমে একটি ইনফিনিটলি স্মল বিন্দুতে চলে আসবে। যার ফলে, ফোটনের দৃষ্টিকোণ থেকে ফোটনকে ১ স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে কোনো প্রকার দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় না।

ফলে সময়েরও প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ফোটন ১ স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে সময় নেবে, সে সাথে দূরত্ব অতিক্রম করবে।

আমরা যদি আলোর বেগে গতিশীল হতে পারতাম, তবে আমাদের জন্য সময় স্থির হয়ে যেত, মহাজগতের সকল স্পেস একটি বিন্দুতে চলে আসতো। কিন্তু আফসোস, কখনোই আলোর বেগ অর্জন করা সম্ভব নয়।

মিউন প্যারাডক্স ব্যাখ্যা (Muon Paradox Explanation)

মহাবিশ্ব আপনার দৃষ্টিতে কেমন হবে, তা আপনার বেগের উপর নির্ভর করে। যাইহোক, এবার লেংথ কন্ট্রাকশন কিভাবে মিউন প্যারাডক্স ব্যাখ্যা করে, তা বলা যাক। পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত পতিত হয় কসমিক রে। মূলত উচ্চগতি এবং শক্তিসম্পন্ন কণা।

এই উচ্চগতি এবং শক্তিসম্পন্ন কণা যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আসে, তখনই কণা ভেঙে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের মৌলিক কণায় রূপ নেয়। এই বিভিন্ন ধরনের মলিক কণার মধ্যে একটি হচ্ছে মিউন। মিউন বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে একদম ইলেকট্রনের মত, তবে ভরের দিক থেকে ভারি। মিউন ইলেকট্রনের চেয়ে ২০০ গুণ ভারি।

এবং মিউন খুবই আনস্টেবল। ফলে এটি অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে ইলেকট্রনে পরিণত হয়। মিউনের গড় আয়ু মাত্র ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড। অর্থাৎ, মিউন তৈরি হবার ২.২ মাইক্রোসেকেন্ডের মধ্যেই ইলেকট্রনে পরিণত হয়ে যায়।

মিউন প্যারাডক্স ব্যাখ্যা (Muon Paradox Explanation)
মিউন প্যারাডক্স এর ব্যাখ্যা (Muon Paradox Explanation)

সাধারণত ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৫ কিলোমিটার উপরে মিউন তৈরি হয়। এবং মিউনের গতি আলোর গতির ৯৯%। এই গতি অনুযায়ী, মিউন ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০০ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারবে। তার মানে ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৫ কিলোমিটার উপরে তৈরি হওয়া মিউন ৫০০ মিটার অতিক্রম করতেই ইলেকট্রনে পরিণত হয়ে যাবে।

সুতরাং ভূপৃষ্ঠে কোনো প্রকার মিউন ডিটেক্ট করা যাবে না বা পাওয়া যাবে না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ভূপৃষ্ঠে প্রতিনিয়ত মিউন পাওয়া যায়। এমনকি ভূপৃষ্ঠের ৭০০ মিটার গভীরেও মিউন পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কিভাবে সম্ভব?

এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে লেংথ কন্ট্রাকশন। আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে মিউনের উচ্চগতির কারণে, এর সময় স্লো হয়ে যাবে, অর্থাৎ ধীরে প্রবাহিত হবে। এখন মিউনের সময় যেহেতু স্লো, সে তো ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড অতিবাহিত হতে আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বেশি সময় লাগাবে।

এবং সেই সময়ে মিউন ভূপৃষ্ঠে চলে আসতে পারবে। এটা হচ্ছে আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে মিউনের ভূপৃষ্ঠে আসার সমাধান। কিন্তু এবার মিউনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করুন। মিউনের বিবেচনায় সে নিজে স্থির। তার কাছে মনে হবে, পৃথিবীসহ মধ্যবর্তী স্পেস তার দিকে গতিশীল।

তার মানে, মিউনের কাছে পৃথিবী আলোর বেগের ৯৯ শতাংশ গতিতে মিউনের দিকে এগিয়ে আসবে। যার ফলে, মিউনের দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীর সমস্ত দৈর্ঘ্য সংকুচিত হয়ে যাবে এবং তার নিজের সময় স্বাভাবিকভাবেই প্রবাহিত হবে। তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মিউনের দৃষ্টিকোণ থেকে মিউন প্যারাডক্সের সমাধান কী?

মিউনের দৃষ্টিকোণ থেকে, যেহেতু পৃথিবী এবং তার মধ্যবর্তী স্পেস উচ্চগতিতে গতিশীল, ফলে এই গতির কারণে লেংথ কন্ট্রাকশন ঘটবে। যার ফলে, ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৫ কিলোমিটার উপরে মিউন তৈরি হলেও মিউনের দৃষ্টিকোণ থেকে সেই দূরত্ব কমে কয়েক মিটারে দাঁড়াবে। যার ফলে, মিউনের গড় আয়ু ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড হলেও সেই সময়ের মধ্যেই মিউন পৃথিবীতে চলে আসতে পারবে।

সুতরাং, মিউন প্যারাডক্সের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তি হচ্ছে টাইম ডাইলেশন এবং মিউনের দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তি হচ্ছে লেংথ কন্ট্রাকশন।

আরও পড়ুনঃ ব্ল্যাক বডি রেডিয়েশন বা কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণ

ল্যাডার বা বার্ন হোল প্যারাডক্স (Ladder paradox)

এবার লেংথ কন্ট্রাকশন সংক্রান্ত একটি খুবই পরিচিত প্যারাডক্স ব্যাখ্যা করা যাক, যার নাম ল্যাডার প্যারাডক্স। ল্যাডার প্যারাডক্সটি ময়ূর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, তবে আমরা ময়ূরের পরিবর্তে ট্রেন বিবেচনা করবো।

মনে করুন, একটি ট্রেন একটি টানেলের মধ্য দিয়ে যাবে এবং টানেলের দৈর্ঘ্য ট্রেনের দৈর্ঘ্যের চেয়ে কিছুটা ছোট। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সম্পূর্ণ ট্রেনটিকে কি ১ মুহূর্তের জন্য টানেলে বন্দি করা যাবে? সাধারণভাবে ভাবলে উত্তর হবে, না—কারণ টানেল ট্রেনের চেয়ে ছোট, সুতরাং ট্রেনটি টানেলে কখনোই ফিট হবে না।

কিন্তু আমরা যদি লেংথ কন্ট্রাকশনের বিষয়টি বিবেচনা করি, তাহলে ট্রেনটি যদি উচ্চগতিতে চলে, তবে তার দৈর্ঘ্য সংকুচিত হবে। ফলে ট্রেনটিকে ১ মুহূর্তের জন্য টানেলে বন্দি করা সম্ভব হবে।

কিন্তু যদি আমরা ট্রেনের ভেতরে থাকা যাত্রীর দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করি, তাহলে দেখা যাবে টানেলটি ট্রেনের দিকে উচ্চগতিতে আসছে। সে ক্ষেত্রে টানেলের দৈর্ঘ্য সংকুচিত হবে এবং ট্রেনের দৈর্ঘ্য অপরিবর্তিত থাকবে। ফলে ট্রেনের যাত্রীর কাছে ট্রেনটি কখনই টানেলের মধ্যে পুরোপুরি ঢুকবে না।

ল্যাডার বা বার্ন হোল প্যারাডক্স
ল্যাডার বা বার্ন হোল প্যারাডক্স

অর্থাৎ, এক দৃষ্টিকোণে ট্রেনটি টানেলে ফিট হচ্ছে, আবার অন্য দৃষ্টিকোণে ফিট হচ্ছে না—এটাই প্যারাডক্স। এখন প্রশ্ন, প্রকৃতি কি প্যারাডক্স এলাও করে? না, প্রকৃতিতে প্যারাডক্স থাকে না। সুতরাং এই সমস্যার সমাধান কী?

এর সমাধান জানতে হলে, আগে নির্ধারণ করতে হবে কখন টানেলের মুখ বন্ধ হবে। মনে করি, ট্রেন যখন টানেলের মাঝখানে থাকবে, তখন মাঝখানে থাকা একটি ডিভাইস থেকে আলোর গতিতে দুই প্রান্তে মুখ বন্ধ হওয়ার সিগন্যাল পাঠানো হবে। এখন, বাইরে থাকা ব্যক্তির বিবেচনায় ট্রেন গতিশীল ফলে ট্রেনের দৈর্ঘ্য সংকোচন ঘটবে এবং ট্রেন টানেলের মাঝে যাবার পর টানেলের মুখ বন্ধ হবার সিগন্যাল সমান সময়ে দুই পাশে যাবে। ফলে একই সময়ে টানেলের মুখ বন্ধ হবে এবং ট্রেন ১ মুহূর্তের জন্য টানেলে বন্দি হবে।

এবার ট্রেনের ভেতরে থাকা যাত্রীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যাক। এই ক্ষেত্রে ট্রেন স্থির, টানেল ট্রেনের দিকে গতিশীল। এখন টানেলের মাঝখানে ট্রেন আসার পর দুই পাশে আলোর গতিতে টানেলের মুখ বন্ধ হবার সিগন্যাল যাবে।

এখানে খেয়াল করুন, টানেল গতিশীল হবার ফলে ডানদিকের মুখে সিগন্যাল আগে পৌঁছাবে, কারণ এই ক্ষেত্রে আলোকে কম দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে। অন্যদিকে, বামদিকে সিগন্যাল পরে পৌঁছাবে, কারণ এই ক্ষেত্রে আলোকে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে।

তার মানে, এই ক্ষেত্রে প্রথমে ডানদিকের মুখ বন্ধ হবে, তারপর বামদিকের মুখ বন্ধ হবে। ফলে ট্রেন টানেলের দরজার সাথে ধাক্কা লাগা ছাড়াই টানেলকে অতিক্রম করতে পারবে।

সুতরাং, বাইরে থাকা ব্যক্তির দৃষ্টিতে দুইটি মুখ একসাথে বন্ধ হলেও, ট্রেনের ভেতরে থাকা যাত্রীর দৃষ্টিতে দুইটি মুখ আগে-পরে বন্ধ হবে। ফলে কোনো প্রকার প্যারাডক্স তৈরি হবে না।

বিষয়গুলো অবাস্তব মনে হলেও কিন্তু সত্য। দুইটি ঘটনা কারো কাছে একসাথে ঘটেছে বলে মনে হতে পারে, আবার কারো কাছে আগে-পরে ঘটেছে বলে মনে হতে পারে। এবং তা নির্ভর করবে আপনি কোন অবস্থান থেকে ঘটনা দুইটি দেখছেন, তার ওপর। সুতরাং আপনি যা দেখছেন তা আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে সঠিক হলেও, অন্য সবার জন্য তা সঠিক নাও হতে পারে।

প্রিয় পাঠক, আশা করছি দৈর্ঘ্য সংকোচন, মিউয়ন এবং মই প্যারাডক্স Length Contraction, Muon & Ladder paradox সংক্রান্ত আর্টিকেলটি আপনার ভালো লেগেছে। নিয়মিত বিজ্ঞান বিষয়ক সাম্প্রতিক তথ্য বা আপডেট পেতে আমাদের সাথে কানেক্ট হোন।

আরও পড়ুনঃ আর্দ্রতা কিভাবে গরম বাড়ায়?

দৈর্ঘ্য সংকোচন, মিউয়ন এবং মই প্যারাডক্স সংক্রান্ত প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন এবং উত্তর

১. দৈর্ঘ্য সংকোচন কাকে বলে?

উত্তর: যে পর্যবেক্ষকের তুলনায় কোনো বস্তু অতি উচ্চ বেগে চলে, সেই পর্যবেক্ষক দেখতে পায় বস্তুর দৈর্ঘ্য চলার দিকে সংকুচিত হয়ে গেছে। এই ঘটনাকে দৈর্ঘ্য সংকোচন বলে।

২. দৈর্ঘ্য সংকোচনের সূত্র কী?

দৈর্ঘ্য সংকোচন, মিউয়ন এবং মই প্যারাডক্স - Length Contraction, Muon and Ladder paradox - Screenshot 6

এখানে,
L = চলন্ত বস্তুর দৈর্ঘ্য
Lo = স্থির অবস্থার দৈর্ঘ্য
V = বস্তুর বেগ
C = আলোর বেগ

৩. দৈর্ঘ্য সংকোচনের বাস্তব প্রমাণ কী?

উত্তর: দৈর্ঘ্য সংকোচনের একটি বাস্তব প্রমাণ হলো, মিউয়ন কণার পৃথিবীপৃষ্ঠে পৌঁছানো।

৪. মিউয়ন কণা কীভাবে উৎপন্ন হয়?

উত্তর: মিউয়ন কণা উৎপন্ন হয় মহাকাশ হতে আগত কসমিক রে যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন বায়ুমণ্ডলের কণার সাথে সংঘর্ষের ফলে মিউয়ন কণা তৈরি হয়।

৫. মিউয়নের গড় আয়ু কত?

উত্তর: স্থির অবস্থায় মিউয়নের গড় আয়ু ২.২ মাইক্রোসেকেন্ড।

তথ্যসূত্র (References):

Share: 

No comments yet! You be the first to comment.

মতামত, পরামর্শ বা অভিযোগ জানান!

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি

Index