বিভিন্ন কাজে ওয়াটার লেভেল বা স্পিরিট লেভেলের ব্যবহার। আশা করি লক্ষ্য করেছেন, যেখানে লিকুইডের মধ্যে থাকা বাবলের মাধ্যমে কোনো একটি সার্ফেস ব্যালেন্স বা ভারসাম্যে আছে কিনা তা পরিমাপ করা হয়। ঠিক এই একই মেকানিজমে আমাদের শরীর তার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষের কানে অ্যান্ডোলিম নামক এক ধরনের ফ্লুইড রয়েছে।
আমাদের শরীর যখন নাড়াচাড়া করে, তখন কানে থাকা এই অ্যান্ডোলিম ফ্লুইডের অবস্থানের পরিবর্তন আসে, যা আমাদের মধ্যে ব্যালেন্স এবং ইমব্যালেন্সের অনুভূতি তৈরি করে। একজন মানুষ যখন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকে, তখন তাকে ভারসাম্য হারাতে দেখা যায়। আসলে অ্যালকোহলের ফলে শরীর ডিহাইড্রেট হয়ে যায়।
এর প্রভাবে কানে থাকা অ্যান্ডোলিম ফ্লুইডের কম্পোজিশন এবং ভলিউম দুটিতেই পরিবর্তন আসে। ফলাফল, নেশাগ্রস্ত মানুষ শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারে না। তার মানে কনস্ট্রাকশনের কাজসহ আমাদের শরীরের ব্যালেন্সের ক্ষেত্রে ফ্লুইড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এখন চিন্তা করুন তো, ফ্লুইডের মধ্যেই যদি কোনো একটি বস্তু থাকে তবে সেটা কিভাবে তার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করবে? বাশ টেবলে থাকবে—এই প্রশ্নের মাধ্যমে আমি মূলত উত্তাল সাগরে জাহাজ কিভাবে তার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে, বাশ টেবলে থাকে—এই বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছি।
আজকের ভিডিওতে মূলত এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বলা হবে। আমি জুম্মান, আছি আপনাদের সাথে। আপনারা দেখছেন বিজ্ঞান পাইছি। জাহাজের স্ট্যাবিলিটির বিষয়ে বলার আগে, কখন একটি সলিড বস্তু লিকুইডে ভাসে তা জানা প্রয়োজন।
কোনো একটি বস্তু পানিতে ভাসবে নাকি ডুবে যাবে—এই বিষয়টি বস্তুর ঘনত্বের উপর নির্ভর করে। পানির ঘনত্ব ১০০০ কেজি পার কিউবিক মিটার। অর্থাৎ ১ মিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট একটি ঘনকে যতটুকু আয়তন, সেই আয়তন পরিমাণ পানির ভর হবে ১০০০ কেজি।
এবার সোয়াবিন তেল বিবেচনা করুন। সোয়াবিন তেলের ঘনত্ব ৯১৬ কেজি পার কিউবিক মিটার। তার মানে সোয়াবিন তেল পানির তুলনায় হালকা। এখন আমরা জানি, হালকা বস্তু উপরে থাকবে এবং ভারী বস্তু নিচে থাকবে। এবং এই জন্যই সোয়াবিন তেল পানিতে ভাসে।
এই ফোমকে বলে পলিস্টাইরিন। এর ঘনত্ব মাত্র ১১ থেকে ৩২ কেজি পার কিউবিক মিটার। তার মানে পলিস্টাইরিন ফোম পানি এবং সোয়াবিন দুটিতেই অনেক বেশি হালকা। এবং এই জন্য পলিস্টাইরিন ফোম পানি এবং সোয়াবিন তেলের উপরে থাকে।
লোহার ঘনত্ব ৭৮০০ কেজি পার কিউবিক মিটার। তার মানে লোহা পানির তুলনায় ৭.৮ গুণ ভারী। যার ফলে একটি লোহার দণ্ড পানিতে ডুবে যায়। এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে—লোহা পানিতে ডুবে গেলেও লোহা দিয়ে তৈরি জাহাজ কেন পানিতে ভাসে?
এই প্রশ্নের উত্তরে আর্কিমিডিসের সূত্র সামনে আসবে। তবে সেই প্রসঙ্গে যাবার আগে পারদ এবং লোহার একটি বিষয় উল্লেখ করি। পারদ কক্ষতাপমাত্রায় লিকুইড অবস্থায় থাকে। এখন পারদে যদি একটি লোহার খণ্ড রাখা হয়, তবে লোহাটি কি পারদে ডুবে যাবে?
উত্তর হচ্ছে—না।
কারণ পারদের ঘনত্ব ১৩,৬০০ কেজি পার কিউবিক মিটার। অন্যদিকে লোহার ঘনত্ব ৭,৮০০ কেজি পার কিউবিক মিটার। তারমানে লোহা পারদের চেয়ে হালকা। যার ফলে পারদের উপর লোহার খণ্ড রাখলে সেটি ডুবে না গিয়ে ভেসে থাকে।
এবার আরকিমিডিসের সূত্রের বিষয়টি বলা যাক। আরকিমিডিসের সূত্র বইয়ের ভাষায় বলতে গেলে কিছুটা জটিল মনে হতে পারে। তবে এখানে যতটা সম্ভব সহজভাবে বলার চেষ্টা করছি। আপনি যখন পানিতে নামেন, তখন নিজেকে কিন্তু কিছুটা হালকা মনে হয়।
তার মানে শরীরের ওজন কিছুটা কমে গিয়েছে বলে মনে হয়। এখন আপনি নিজেকে কতটা হালকা মনে করবেন, সেটাই আরকিমিডিস তার সূত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছিলেন। কোনো একটি বস্তু তরলে রাখলে সেখানে দুটি ফোর্স বা বল কাজ করে— একটি গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষণ, অন্যটি বয়ান্সি বা প্রলোভতা।
মহাকর্ষণ বা বস্তুর ওজন সরাসরি নিচের দিকে ক্রিয়া করে। অন্যদিকে বয়ান্সি বা প্রলোভতা সরাসরি উপরের দিকে ক্রিয়া করে। এখন প্রশ্ন হলো, তরল কেন কোনো একটি বস্তুকে উপরের দিকে ঠেলে দিতে চাইবে?
আসলে তরল কিংবা যেকোনো ফ্লুইডের মধ্যে একটি বস্তু রাখলে, ফ্লুইড বস্তুটিকে চারদিক থেকে চাপ দিতে থাকে। এই চাপ বস্তুটি ফ্লুইডের সারফেস থেকে কতটা নিচে রয়েছে তার উপর নির্ভর করে। যা এই চিত্র থেকে বুঝতে পারবেন।
এখানে দুই পাশের চাপ পরস্পরকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। কিন্তু উপরের ও নিচের চাপ পরস্পরকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে না। কারণ এই দুই ক্ষেত্রে ফ্লুইডের সারফেস থেকে গভীরতা ভিন্ন। যার ফলে উপরের ও নিচের চাপ সমান থাকে না।
এই ক্ষেত্রে উপর থেকে নিচের দিকে চাপ কম এবং নিচ থেকে উপরের দিকে চাপ বেশি হয়। যার ফলে এই দুই চাপ পরস্পরের উপর ক্রিয়া করে শেষ পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী বল তৈরি করে, যাকে বলা হয় বয়ান্সি বা প্রলোভতা। প্রলোভতার কারণেই আমরা পানিতে নামলে কিছুটা হালকা অনুভব করি।
এবং আপনি কতটা হালকা অনুভব করবেন, তা নির্ভর করে আপনি কতটুকু পানি অপসারণ করেছেন তার উপর। আপনার শরীর থেকে অপসারিত পানির ওজনের সমান ওজন কম অনুভূত হয়। বা ভি রো এল জি—এই সূত্রে প্রকাশ করা হয়।
এখানে ভি হচ্ছে আপনি কতটুকু পানি অপসারণ করেছেন, তার আয়তন। রো হচ্ছে পানির ঘনত্ব এবং জি হচ্ছে অভিকর্ষ ত্বরণ। যাই হোক, এবার বস্তুর ভাসা বা ডুবে যাওয়ার প্রসঙ্গে আসা যাক।
কোনো একটি বস্তুকে তরলে রাখলে গ্র্যাভিটি বা ওজন এমজি নিচের দিকে ক্রিয়া করে। এখানে রো ও হচ্ছে বস্তুটির ঘনত্ব। অন্যদিকে বয়ান্সি বা ভি রো এল জি উপরের দিকে ক্রিয়া করে।
এখন এই বিপরীতমুখী দুই ফোর্সের মধ্যে কে বেশি শক্তিশালী— তার উপর নির্ভর করে বস্তুটি ভাসবে নাকি ডুবে যাবে। এখানে খেয়াল করুন, গ্র্যাভিটি ও বয়ান্সি—দুটির সূত্রেই আছে ভি রো জি, তবে শুধু ঘনত্বের পার্থক্য রয়েছে।
গ্র্যাভিটির ক্ষেত্রে ঘনত্ব হবে বস্তুর ঘনত্ব বা রো ও, এবং বয়ান্সির ক্ষেত্রে ঘনত্ব হবে তরলের ঘনত্ব। তাহলে এখন সহজেই বুঝতে পারছেন, এখানে যার ঘনত্ব বেশি হবে, সেই জয়ী হবে। বস্তুর ঘনত্ব যদি তরলের ঘনত্বের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে গ্র্যাভিটি জয়ী হবে।
ফলাফল, বস্তুটি পানিতে ডুবে যাবে, যেমনটা লোহার ক্ষেত্রে দেখা যায়। বস্তুর ঘনত্ব লিকুইডের ঘনত্বের সমান হলে গ্রাভিটি কিংবা বয়ান্সী কেউই জয়ী হবে না। ফলাফল, বস্তুটি সম্পূর্ণ নিমজ্জিত অবস্থায় ভাসবে, যেমনটা বরফের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
বরফ এবং পানির ঘনত্ব সমান, ফলে বরফ খণ্ড পানিতে রাখলে বরফ খণ্ডটি সম্পূর্ণ নিমজ্জিত অবস্থায় ভাসে। বস্তুর ঘনত্ব লিকুইডের ঘনত্বের চেয়ে কম হলে বয়ান্সী জয়ী হবে। ফলাফল, বস্তুটি ভাসবে, যেমনটা পলিস্টাইরিন ফোমের ক্ষেত্রে দেখা যায়। আবার জাহাজের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, জাহাজ লোহা কিংবা ভারী ধাতু দিয়ে তৈরি হলেও, জাহাজের মাঝখানে বিশাল ফাঁকা স্থান থাকে, যেখানে মূলত থাকে বাতাস।
এখন জাহাজের ক্ষেত্রে লোহা এবং ফাঁকা স্থানে থাকা বাতাসের সম্মিলিত ঘনত্ব হিসেব করতে হবে। সেক্ষেত্রে দেখা যায়, জাহাজ এবং বাতাসের সম্মিলিত ঘনত্ব পানির ঘনত্বের চেয়ে কম হয়। ফলাফল, বয়ান্সী এগিয়ে থাকে এবং জাহাজ পানিতে ভাসে। এই তো গেল, কিভাবে বা কেন কোন একটি বস্তু লিকুইডে ভাসে।
এখন জাহাজ কিভাবে পানিতে স্ট্যাবল থাকে, সেই বিষয়টি বলা যাক। এই লম্বা ধাতুটির সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি হচ্ছে এ পয়েন্ট। এখন বস্তুটিকে সোজা করে দাঁড় করালে, সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি থেকে গ্র্যাভিটি সরাসরি নিচের দিকে ক্রিয়া করবে। এখন এই বিন্দু থেকে নিচের দিকে একদম ভূমি পর্যন্ত বস্তুটি নিজে রয়েছে, যা গ্র্যাভিটি ফোর্সকে কাউন্টার করবে। ফলাফল, বস্তুটি দাঁড়িয়ে থাকবে।
এবার বস্তুটিকে একটু কাত করালে কী হবে? আগের মতোই বস্তুটির সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি থেকে বরাবর নিচের দিকে গ্র্যাভিটি ক্রিয়া করবে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে গ্র্যাভিটিকে কাউন্টার করতে নিচের দিকে কিছু নেই। ফলাফল, বস্তুটি দাঁড়িয়ে না থেকে পড়ে যাবে। কিন্তু আমরা যদি গ্র্যাভিটিকে কাউন্টার করার জন্য কোনো একটি ব্যবস্থা করি, অর্থাৎ নিচে থেকে একটি সাপোর্ট দেই কিংবা দড়ি দিয়ে উপর থেকে আটকে রাখি, তবে বস্তুটি আর পড়ে যাবে না, বরং কাত অবস্থায় থেকেই স্ট্যাবল অবস্থায় থাকবে।
এবার একটি জাহাজের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো দেখা যাক। জাহাজের ক্ষেত্রে কিন্তু ২ ধরনের ফোর্স কাজ করবে—একটি হচ্ছে গ্র্যাভিটি, অন্যটি হচ্ছে বয়ান্সী। তার মানে, এই ক্ষেত্রে ২ ধরনের সেন্টার থাকবে—একটি হচ্ছে সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি এবং অন্যটি হচ্ছে সেন্টার অফ বয়ান্সী।
মনে করুন, জাহাজের এই বিন্দুটি হচ্ছে সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি। তার মানে, এখান থেকে নিচ বরাবর গ্র্যাভিটি ক্রিয়া করবে। অন্যদিকে, সেন্টার অফ বয়ান্সী হচ্ছে এ-বিন্দু, যেখান থেকে বরাবর উপরের দিকে বয়ান্সী ক্রিয়া করবে।
এখন এই ২ ফোর্সের মধ্যে একদম প্রাথমিক পর্যায়ে, অর্থাৎ যখন জাহাজটিকে পানিতে নামানো হয়নি, তখন শুধুমাত্র গ্র্যাভিটি ক্রিয়া করবে। কিন্তু যখন জাহাজটিকে পানিতে নামানো হবে, তখন আস্তে আস্তে বয়ান্সীও ক্রিয়া করতে থাকবে। এভাবে জাহাজটি পানিতে নামার সাথে সাথে, এক সময় গ্র্যাভিটি এবং বয়ান্সী সমান হবে, যার ফলে জাহাজটি কিছুটা নিমজ্জিত অবস্থায় পানিতে ভাসবে।
এবং এমন ক্ষেত্রে সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি জি এবং সেন্টার অফ বয়ন্সি বি পরস্পরের সমান এবং বরাবরই অবস্থান করবে। অর্থাৎ ১ লাইনে অবস্থান করবে, যাকে বলা হয় সেন্ট্রাল লাইন। এখন বাতাস কিংবা ঢেউর প্রভাবে জাহাজ যদি কোনো একদিকে কাত হয়ে যায়, তখন জাহাজের সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি কিন্তু আগের অবস্থানেই থাকবে, কারণ জাহাজের ভরের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
অন্যদিকে, সেন্টার অফ বয়ন্সি জাহাজ যেদিকে কাত হয়েছে সেদিকে সরে যাবে। কারণ কাত হওয়ার দিকে পানির পরিমাণ বেড়ে যাবে, যার ফলে বয়ন্সিও সেদিকে সরে যাবে। এখন মনে করি, এমন পরিস্থিতিতে নতুন সেন্টার অফ বয়ন্সি বি ওয়ান। এখন এমন সিচুয়েশনে কি ঘটবে?
স্বাভাবিকভাবে, জাহাজ সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি থেকে নিচের দিকে বল অনুভব করবে। অন্যদিকে বয়ন্সি পয়েন্ট থেকে উপরের দিকে বল অনুভব করবে। ফলাফল, জাহাজ পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থানে চলে আসবে, যাকে বলা হয় রাইটিং মোমেন্ট। অর্থাৎ, এক্ষেত্রে জাহাজ প্রাকৃতিক নিয়মে টেবল অবস্থায় আসবে।
এবার একই বিষয় একটু ভিন্নভাবে দেখা যাক। এক্ষেত্রে, সেন্টার অফ গ্র্যাভিটিকে আগের অবস্থান থেকে কিছুটা উপরে বিবেচনা করা যাক। এখন ঢেউ কিংবা বাতাসের প্রভাবে জাহাজ কোনো এক দিকে হেলে পড়লে কি ঘটবে?
এক্ষেত্রে, সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি এবং সেন্টার অফ বয়ন্সি এমন অবস্থায় থাকে, যাদের ক্রিয়ার ফলে জাহাজ আরও কাত হয়ে যাবে। এবং ততক্ষণ কাজ হতে থাকবে যতক্ষণ সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি এবং নতুন সেন্টার অফ বয়ন্সি পয়েন্ট ১ লাইনে না আসে।
গ্র্যাভিটি এবং বয়ন্সি পয়েন্ট ১ লাইনে আসার পর জাহাজ ওই কাত অবস্থায় থেকে যাবে। অর্থাৎ তখন জাহাজটি ডুবে যাবে না, তবে এমন কাত অবস্থাতেই থেকে যাবে। এমন অবস্থায় জাহাজটিকে সোজা করার জন্য যেদিকে কাত হয়েছে তার বিপরীত দিকে অ্যাক্সিডেন্টাল ফোর্স এপ্লাই করতে হবে, অন্যথায় জাহাজটি কখনোই সোজা হবে না।
অন্যদিকে, এই অবস্থায় যদি সেই দিক থেকে বল প্রয়োগ করা হয়—অর্থাৎ আরও বাতাস বা ঢেউ আঘাত করে—তবে জাহাজ আর ভেসে থাকতে পারবে না। তাহলে এখান থেকে দেখা যাচ্ছে, জাহাজের সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
জাহাজ কাজ হবার পর সেন্টার লাইন এবং সেন্টার অফ বয়ন্সি যেখানে মিলিত হয়, তাকে বলে মেটা সেন্টার। এই মেটা সেন্টার যদি সেন্টার অফ গ্র্যাভিটির উপরে থাকে তবে জাহাজ নিজ থেকেই সোজা হয়ে যাবে। কিন্তু মেটা সেন্টার যদি সেন্টার অফ গ্র্যাভিটির নিচে থাকে, তবে জাহাজ কাত হলে তা একটি পর্যায় পর্যন্ত কাত হতেই থাকবে এবং কাত অবস্থায় একটি জায়গায় স্টেবল হবে।
এবং এরপর যদি আরও কাত হয়, তবে জাহাজ ডুবে যাবে। তার মানে, জাহাজ স্ট্যাবল রাখতে হলে মেটা সেন্টারকে অবশ্যই সেন্টার অফ গ্র্যাভিটির উপরে রাখতে হবে।
সেন্টারকে অবশ্যই সেন্টার অফ গ্র্যাভিটির উপরে থাকতে হবে। এবং এই জন্য জাহাজের সেন্টার অফ গ্র্যাভিটিকে যতটা সম্ভব নিচে রাখতে হয়। জাহাজ নির্মাণ করার সময় এই বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বের সাথে লক্ষ্য রাখা হয়।
এখানে আরেকটি বিষয় বলে রাখি—আমরা জাহাজের সেন্টার অফ গ্র্যাভিটিকে একটি ফিক্সড পয়েন্টে বিবেচনা করেছি। কিন্তু জাহাজ লোড করার সময় কোন পাশে কতটা লোড দেয়া হচ্ছে, তার উপর ভিত্তি করে কিন্তু জাহাজের সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি পরিবর্তন হবে।
এই তো গেল প্রাকৃতিকভাবে জাহাজকে স্ট্যাবল রাখার বিষয়। এর বাইরেও জাহাজকে স্ট্যাবল রাখার ক্ষেত্রে আরো বিভিন্ন মেকানিজম ব্যবহার করা হয়। এখন সেই মেকানিজমগুলোকেই সেগুলো বলা যাক।
একটি পারফেক্ট জাহাজ ঢেউয়ের ফলে একপাশে কাত হলেও আবার সোজা হয়ে যাবে। কিন্তু সাগরে ঢেউ ক্রমাগত চলমান। তার মানে, জাহাজ ঢেউয়ের সাথে সাথে একপাশ থেকে অন্যপাশে কাত হতে থাকবে, অর্থাৎ দুলতে থাকবে।
এখন এমন অবস্থায় জাহাজকে স্ট্যাবল রাখার জন্য ঢেউয়ের ফলে যে ফোর্স তৈরি হচ্ছে, তার বিপরীতে কাউন্টার ফোর্সের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে জাহাজের নিচের দিকে দুই পাশে দুটি পানির চেম্বার থাকে এবং এরা পাইপের মাধ্যমে পরস্পরের সাথে সংযুক্ত থাকে।
এখন জাহাজ ডানপাশে কাত হবার সময়, বাম পাশের চেম্বারে যদি বেশি পরিমাণ পানি রাখা যায়, তবে জাহাজের সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি কিছুটা বাম দিকে সরে যাবে, যা জাহাজের ডানদিকে কাত হবার বিপরীতে কাজ করবে।
এতে একেতো জাহাজ যতটা ডান দিকে কাত হবার কথা ছিল, ততটা হবে না। সেই সাথে যতটুকু কাত হয়েছে, তা খুব দ্রুত স্ট্যাবল অবস্থায় চলে আসবে। একইভাবে জাহাজ বাম দিকে কাত হবার সময়, ডান পাশের চেম্বারে বেশি পানি রাখতে হবে।
কিন্তু এখানে খেয়াল করুন—স্বাভাবিকভাবে জাহাজ কোন একদিকে কাত হলে, ওই দিকের চেম্বারে বেশি পানি থাকবে। কিন্তু জাহাজের স্ট্যাবিলিটির জন্য এর বিপরীত অবস্থার প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে, চেম্বার দুইটি সংযুক্ত পাইপে পাম্প মেশিন যুক্ত থাকে। সেই সাথে জায়রোস্কোপ যুক্ত থাকে। জাহাজ কতটা বা কোনদিকে কাত হয়েছে, জায়রোস্কোপের মাধ্যমে সেটা বোঝা যায়। এবং সে অনুযায়ী পাম্প মেশিন পানি পাম্প করে, যা জাহাজকে স্ট্যাবল রাখে।
এর বাইরে, জাহাজের কাঠামোগত কিছু পরিবর্তন করে জাহাজের স্ট্যাবিলিটি বাড়ানো যায়। যেমন ঢেউয়ের সাথে সাথে জাহাজ দুলবে। এখন ঢেউয়ের ফলে যে ফোর্স তৈরি হয়, তার প্রভাব কিছুটা কমানোর জন্য জাহাজের নিচের দিকে দুই পাশে এক্সট্রা অংশ যুক্ত থাকে, যাকে বলা হয় বিল্জ কিল।
এর ফলে জাহাজ অ্যাক্সিডেন্টাল ফোর্সের কারণে কাত হবার সময় পানিতে টার্বুলেন্স তৈরি করে, যা জাহাজের কাত হবার বিষয়টিকে কমিয়ে নিয়ে আসে। বিল্জ কিল ছাড়াও জাহাজে ফিন বা পাখা ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে, জাহাজের দুই পাশে দুটি পাখা থাকে।
যে পাখাগুলো আলাদা আলাদা ভাবে মুভ করতে পারে, এই পাখাগুলো সে বিমানের পাখার মতো। বিমান এবং জাহাজ দুইটি কিন্তু ফ্লুইডের মধ্যে দিয়ে চলে, অর্থাৎ বাতাস এবং পানি দুইটিই হচ্ছে ফ্লুইড। যার ফলে এই দুই মাধ্যমের আচরণের ক্ষেত্রে সামান্য দৃষ্টিসাম্য পাওয়া যায়।
জাহাজের পাখাকে জায়রোস্কোপের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী উপরে-নিচে করে, পাখায় পানির প্রেসার পরিবর্তন করে জাহাজকে স্ট্যাবল রাখা হয়। তবে ফিন স্ট্যাবিলাইজার জাহাজ যখন একটি নির্দিষ্ট গতির বেশি গতিতে চলতে থাকে, তখনই কেবল কার্যকর হয়।
কারণ পানির প্রবাহ যখন পাখাকে ক্রস করবে, তখনই পাখায় প্রেসারের বিষয়টি কার্যকর হবে। যার ফলে ফিন স্ট্যাবিলাইজার কাজ করার জন্য জাহাজকে একটি নির্দিষ্ট গতির বেশি গতিতে চলতে হয়। এবং এই জন্য কার্গোশিপে সাধারণত ফিন স্ট্যাবিলাইজার যুক্ত করা হয় না।
কারণ ফিন স্ট্যাবিলাইজার কাজ করার জন্য যতটা স্পিড দরকার, কার্গোশিপ সাধারণত ততটা স্পিডে চলাচল করে না। এই তো গেল বড় শিপের বিষয়। এর বাইরে ছোট শিপ বা জলযানের ক্ষেত্রে জায়রোস্কোপিক স্ট্যাবিলাইজার ব্যবহার করা হয়।
যেখানে শিপের সাপেক্ষে নাইন্টি ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে একটি উচ্চগতিতে ঘূর্ণনক্ষম কাঠামো থাকে। এই ঘূর্ণন থেকে নাইন্টি ডিগ্রিতে ফোর্স তৈরি হয়। এখন এই ফোর্স ডান দিকে না বাম দিকে কাজ করবে, সেটা নির্ভর করে ঘূর্ণন কাঠামোটি কোন অরিয়েন্টেশনে রয়েছে, তার ওপর।
এখন ঘূর্ণন কাঠামো আগে-পিছে সরে গিয়ে ঢেউয়ের বিপরীত দিকে ফোর্স তৈরি করে, যা ঢেউয়ের কাউন্টার ফোর্স হিসেবে কাজ করে। যার ফলে শিপ স্ট্যাবল থাকে। এই ধরনের জায়রোস্কোপিক স্ট্যাবিলাইজার খুবই চমৎকারভাবে কাজ করে।
এর বাইরে রেস্কিউশিপের ক্ষেত্রে এমন টেকনোলজি নিয়ে আসা হয়েছে, যেখানে শিপটি একদম উল্টে গেলেও কিছুক্ষণের মধ্যে নিজে নিজেই স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে পারে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৮০ থেকে ৯০% সম্পন্ন হয় নৌপথে বা জলপথে চলাচলের মাধ্যমে।
যার ফলে এই পথে যাতায়াত সুরক্ষিত এবং নিরাপদ করার প্রচেষ্টা প্রতিনিয়ত চলমান। আজকের ভিডিওতে শুধুমাত্র জাহাজের স্ট্যাবিলিটির মৌলিক বিষয়গুলো বলা হয়েছে। এর বাইরে জাহাজে প্রচুর ছোট থেকে বড় ইঞ্জিনিয়ারিং রয়েছে।
এমনকি এই প্রযুক্তি এতটাই বিশাল যে, এসব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পড়াশোনা রয়েছে। পৃথিবীর এই ফ্ল্যাট ম্যাপের সাথে আমরা খুব ভালোভাবেই পরিচিত। তবে আমরা পৃথিবীর যত ধরনের ফ্ল্যাট ম্যাপ দেখি, তার সবগুলোই কোন না কোন দিক থেকে ভুল।
এমনকি পৃথিবীর হান্ড্রেড পার্সেন্ট নির্ভুল ফ্ল্যাট ম্যাপ তৈরি করাই সম্ভব না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এমনটা কেন? এই প্রশ্নসহ পৃথিবীর ম্যাপসম্পৃক্ত বিভিন্ন বিষয় জানতে এই ভিডিওটি দেখতে পারেন।

Comments