Homeসহজ বিজ্ঞানঅক্ষাংশ, দ্রাঘিমা, টাইম জোন, আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা Latitude, longitude

অক্ষাংশ, দ্রাঘিমা, টাইম জোন, আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা Latitude, longitude

অক্ষাংশ, দ্রাঘিমা, টাইম জোন, আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা Latitude, longitude

মনে করুন আপনি শুক্রবার দুপুর ঠিক দুইটায় বাংলাদেশ থেকে কানাডার টরেন্টোর উদ্দেশ্যে রওনা করলেন টরেন্টোতে যেতে। আপনার ১১ ঘণ্টা সময় লাগলো। তাহলে টরেন্টোতে পৌঁছানোর পর আপনার ঘড়িতে কয়টা বাজবে? উত্তর খুবই সহজ—দুপুর দুইটার সাথে ১১ ঘণ্টা যোগ করলে হবে পরদিন, অর্থাৎ শনিবার রাত একটা।

কিন্তু না, এখানে চমৎকার বিষয় হচ্ছে—আপনি বাংলাদেশ থেকে ঠিক যে সময়ে রওনা করেছিলেন, টরেন্টোতে নেমে দেখবেন, সেখানে ঠিক সেই সময় চলছে, অর্থাৎ শুক্রবার দুপুর দুইটা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—আপনি যে ১১ ঘণ্টা জার্নি করলেন, এই সময়টুকু কোথায় গেল? আপনার জীবন থেকে কি এই ১১ ঘণ্টা হারিয়ে গেল?

উত্তর হচ্ছে না। আপনার জীবন থেকে ১১ ঘণ্টা হারিয়ে যায়নি, বরং আপনার জীবনের ১১ ঘণ্টা টাইমজোনের ফাঁদে আটকে গিয়েছে। শুধু কি ১১ ঘণ্টা? মাত্র কয়েক কিলোমিটার জার্নি করে আপনি সম্পূর্ণ একদিন পেছনে কিংবা সামনে চলে যেতে পারবেন—যদি টাইমজোন সম্পর্কে আপনার ভালো ধারণা থাকে।

এখনই টাইমজোন বুঝতে হলে আপনাকে দ্রাঘিমা, অক্ষাংশ—এই বিষয়গুলোও বুঝতে হবে। আজকের ভিডিওতে এই দ্রাঘিমা, অক্ষাংশ, টাইমজোন, আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা—এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বলা হবে। আমি জুম্মান, আছি আপনাদের সাথে। আপনারা দেখছেন “বিজ্ঞান পাইছি”।

আমেরিকাকে আমরা পশ্চিমের দেশ বলে থাকি। তার মানে, বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম দিকে হাঁটতে থাকলে আমরা আমেরিকাতে পৌঁছে যাব। অবশ্য পৃথিবীর ম্যাপ দেখলে সহজেই বোঝা যায়, আমেরিকা বাংলাদেশের পশ্চিমে অবস্থিত।

এবার পৃথিবীর ম্যাপকে একটু অন্যভাবে দেখা যাক। এখান থেকে বলুন তো, আমেরিকা বাংলাদেশের কোনদিকে অবস্থিত? এর উত্তর হচ্ছে—পূর্বদিকে। আসলে আমেরিকা বাংলাদেশের পশ্চিম দিকে কিংবা পূর্ব দিকে যাই বলুন না কেন, যৌক্তিকভাবে দুইটি কথাই সঠিক।

কারণ পৃথিবী গোলাকার। ফলে পশ্চিম দিক বরাবর হাঁটতে থাকলে আমেরিকাতে যাওয়া যাবে, আবার পূর্বদিক বরাবর হাঁটলেও আমেরিকা যাওয়া যাবে। তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে—কিসের ভিত্তিতে এটা নির্ধারণ করা হলো যে, আমেরিকা বাংলাদেশের পূর্বে নয় বরং পশ্চিমে অবস্থিত?

এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে আপনাকে দ্রাঘিমা এবং অক্ষাংশ বুঝতে হবে। গ্রাফ পেপারে একটি নির্দিষ্ট বিন্দু বা স্থানকে নির্দেশ করার জন্য আমরা X অক্ষ এবং Y অক্ষ বরাবর কত ঘর যেতে হবে তা উল্লেখ করে থাকি।

যেমন, এই বিন্দুতে পৌঁছানোর জন্য X অক্ষের ধনাত্মক দিক বা পূর্ব দিক বরাবর ১০ ঘর এবং Y অক্ষের ধনাত্মক দিক বা উত্তর দিক বরাবর ৭ ঘর যেতে হবে। আবার এই বিন্দুর ক্ষেত্রে—X অক্ষের ঋণাত্মক দিক বা পশ্চিম দিক বরাবর ৭ ঘর যেতে হবে এবং Y অক্ষের ঋণাত্মক দিক বা দক্ষিণ দিক বরাবর ৯ ঘর যেতে হবে।

এখন এই বিষয়টি পৃথিবীর ক্ষেত্রে চিন্তা করুন। পৃথিবীর কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানকে চিহ্নিত করার জন্য গ্রাফ পেপারের X এবং ওয়াই অক্ষের মতো কিছু একটা দরকার, তখনই সামনে আসে দ্রাঘিমা এবং অক্ষাংশ। পৃথিবী পৃষ্ঠের উপর দিয়ে উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত কল্পিত রেখাকে বলা হয় দ্রাঘিমা। এখন পৃথিবী যেহেতু গ্রাফ পেপারের মতো ফ্ল্যাট নয়, বরং গোলাকার, ফলে দ্রাঘিমা রেখাগুলোর একক হিসাব করা হয় ডিগ্রিতে।

দ্রাঘিমার সাথে সমকোণে কল্পিত রেখাকে বলা হয় অক্ষাংশ। এটিও ডিগ্রিতে হিসাব করা হয়, যা পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে মাপা হয়। এখন দ্রাঘিমা এবং অক্ষাংশকে যদি আমরা একটি ফ্ল্যাট সারফেসের মতো বিবেচনা করি, তবে তা দেখতে হবে গ্রাফ পেপারের মতো—যার উপর থেকে নিচের রেখাগুলো দ্রাঘিমা এবং বাম থেকে ডানদিকের রেখাগুলো অক্ষাংশ।

এখন এখানে সাধারণ গ্রাফের মতো একটি প্রধান X অক্ষ এবং একটি প্রধান Y অক্ষ নির্ধারণ করা দরকার। সেক্ষেত্রে পৃথিবীর পরিধি বরাবর কল্পিত রেখাগুলোর মধ্যে একটি প্রধান রেখা সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা করা হয়। প্রধান Y অক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় ইংল্যান্ডে অবস্থিত রয়েল গ্রিনউইচ অবজারভেটরির বরাবর কল্পিত রেখাকে, যাকে আবার প্রাইম মেরিডিয়ানও বলা হয়।

এবার এখান থেকে আপনি খুব সহজেই পৃথিবীর কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানকে অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমার মাধ্যমে চিহ্নিত করতে পারবেন। তবে এখানে আরেকটি কথা রয়েছে। পৃথিবীর পরিধি বরাবর কল্পিত রেখাকে প্রধান দ্রাঘিমা বা শূন্য ডিগ্রি বিবেচনা করলে, গোলাকার পৃথিবীতে ৩৬০ ডিগ্রির জন্য ৩৬০টি রেখা কল্পনা করা যায়।

যার অর্ধেক থাকবে প্রাইম মেরিডিয়ানের পূর্ব পাশে এবং বাকি অর্ধেক থাকবে পশ্চিম পাশে। অর্থাৎ, প্রাইম মেরিডিয়ানের পূর্ব পাশে ১৮০ ডিগ্রি এবং পশ্চিম পাশে ১৮০ ডিগ্রি। আর প্রধান অক্ষাংশ বা X অক্ষ যেহেতু পৃথিবীর পরিধির উপর অবস্থিত, সেও তো উপরের দিকে উত্তর মেরু পর্যন্ত ৯০ ডিগ্রি এবং নিচের দিকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত ৯০ ডিগ্রি করে, মোট ১৮০টি রেখা কল্পনা করা যায়।

তাহলে আমরা একটি পরিপূর্ণ গ্রাফ পেয়ে গেলাম, যেখানে Y অক্ষের ধনাত্মক দিক দ্বারা উত্তর এবং ঋণাত্মক দিক দ্বারা দক্ষিণ বোঝানো হবে। আর X অক্ষের ধনাত্মক দিক দ্বারা পূর্ব এবং ঋণাত্মক দিক দ্বারা পশ্চিম বোঝানো হবে। তার মানে, এই স্থানটির কো-অর্ডিনেট হবে ২৩ ডিগ্রি নর্থ এবং ৯০ ডিগ্রি ইস্ট।

এখানে প্রথম অংশ হচ্ছে অক্ষাংশ এবং দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে দ্রাঘিমা। এভাবে আমরা পৃথিবীর যেকোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানকে দ্রাঘিমা এবং অক্ষাংশের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে পারি। এবার বলা যাক, আমেরিকাকে কেন পশ্চিম পাশে রাখা হয়েছে।

আমরা প্রাইম মেরিডিয়ান থেকে যদি পূর্ব দিকে হাঁটতে থাকি, তবে ৩৬০ ডিগ্রি হাঁটার পর আমরা আবার প্রাইম মেরিডিয়ানে চলে আসব। এই ক্ষেত্রে আমরা শুধু পূর্ব দিকে হেঁটেই প্রাথমিক অবস্থানে ফিরে আসতে পারি। অর্থাৎ এমন চিন্তার ক্ষেত্রে পশ্চিম দিক বলতে কিছুই থাকছে না।

এই সমস্যা সমাধানের জন্যই প্রাইম মেরিডিয়ান থেকে পূর্ব দিকে শুধুমাত্র ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত পূর্ব বিবেচনা করা হয় এবং বাকি ১৮০ ডিগ্রিকে পশ্চিম দিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ, প্রাইম মেরিডিয়ান থেকে ১৮০ ডিগ্রি হেঁটে জাপানে পৌঁছনোর পর পূর্বদিকে সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু তারপরেও তো দেশ রয়েছে। এক্ষেত্রে সেই দেশগুলোকে পশ্চিমের দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এবং এই জন্যই পৃথিবীর ম্যাপ এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে প্রাইম মেরিডিয়ান প্রায় মাঝখানের দিকে রয়েছে। পূর্ব দিকে শেষের দিকে রয়েছে জাপান, রাশিয়া এবং পশ্চিমে শেষের দিকে রয়েছে আমেরিকা। এবং এইজন্যই আমেরিকাকে পশ্চিমের দেশ বলা হয়।

কিন্তু শূন্য ডিগ্রি দ্রাঘিমা বা প্রাইম মেরিডিয়ানকে যদি গ্রিনউইচ-এর পরিবর্তে অন্য কোনো স্থানে বিবেচনা করা হয়, সেক্ষেত্রে কিন্তু পৃথিবীর ম্যাপ এমনভাবে উপস্থাপন করা হতো, যেন নতুন প্রাইম মেরিডিয়ান মাঝ বরাবর থাকে। যেমন উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে—প্রাইম মেরিডিয়ান যদি বাংলাদেশের উপর দিয়ে বিবেচনা করা হতো, সেক্ষেত্রে পৃথিবীর ম্যাপকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হতো, যেখানে বাংলাদেশ থাকত প্রায় মাঝ বরাবর।

এখানে মূল কথা হচ্ছে, গোলাকার কোনো বস্তুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উত্তর, দক্ষিণ কিংবা পূর্ব, পশ্চিম—এই বিষয়গুলো নেই। এখন পৃথিবীও গোলাকার। সুতরাং পৃথিবীর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম এই বিষয়গুলো নেই।

কিন্তু তারপরেও আমাদের প্রতিদিনকার জীবনকে সহজ করার জন্য পৃথিবীতে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ এই বিষয়গুলোকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এবং এই জন্য আমরা আমেরিকাকে পশ্চিমের দেশ হিসেবে বিবেচনা করি, আবার জাপানকে পূর্বের দেশ হিসেবে বিবেচনা করি।

যাই হোক, এবার টাইমজোনের বিষয়টি বলা যাক। সূর্য এবং পৃথিবীর যে কোনো একটি মুহূর্ত বিবেচনা করলে দেখা যাবে, পৃথিবীর এক পাশে দিন এবং অন্য পাশে রাত। এবং রাত-দিনের সংযোগস্থলগুলোর কোনো একটিতে ভোর হলে, বিপরীত দিকে হবে সন্ধ্যা।

এখন পৃথিবীটা নিজ অক্ষে পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে ঘোরে। অর্থাৎ, সেই হিসেবে এই অংশের রাত-দিনের সংযোগস্থলে হবে ভোর, এবং বিপরীত অংশে হবে সন্ধ্যা। এখন এখানে খেয়াল করুন—পৃথিবীর কোথায় আগে ভোর হচ্ছে, তা কিন্তু নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।

কারণ এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যদি বলে, বাংলাদেশের দিক থেকেই দিনের শুরু হচ্ছে, তা যেমন ভুল হবে না, আবার যদি সৌদি আরব বলে, তাদের দেশ থেকে দিনের শুরু হচ্ছে—সেটাও কিন্তু ভুল হবে না। অর্থাৎ, যেকোনো দেশ তাদের নিজ দেশকে সূর্যোদয়ের দেশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে বা দাবি করতে পারে।

যার ফলে একটি চক্রাকার সমস্যা তৈরি হবে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য দিনের শুরু কোথা থেকে হবে, তা নির্দিষ্ট করার জন্য একটি ঐক্যমতের প্রয়োজন। এবং সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই সামনে আসে টাইমজোন, দ্রাঘিমা।

অক্ষমসের অংশে আমরা দেখেছি যে, পৃথিবীর ক্ষেত্রে সর্বশেষ পূর্বের দেশ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে জাপান কিংবা ওই দ্রাঘিমার দেশগুলো। এখন পৃথিবী যেহেতু নিজ অক্ষে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিক বরাবর ঘোরে, সেও তো পূর্বের দেশেই দিনের সূচনা হবে। অর্থাৎ, সূর্য উদয় হবে এবং সেই জন্যই জাপানকে সূর্য উদয়ের দেশ বলা হয়।

যদিও এই বিষয়টি অন্য যে কোনো দেশ হতে পারতো, তবে আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যে, ১৮০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার দেশগুলো থেকেই দিনের শুরু। এই বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, জাপানের সূর্য উদয়ের মাধ্যমে দিনের শুরু হলে জাপানের পশ্চিমে থাকা দেশগুলো জাপানের সময় থেকে পিছিয়ে থাকবে।

যার ফলে জাপানে যখন ভোর হয়, বাংলাদেশে তখন মধ্যরাত বিদ্যমান থাকে। এই বিষয়টিকে আরেকটু বিস্তারিত বলা যাক। ধরে নেয়া যাক, জাপানে সূর্যোদয় হচ্ছে। তার মানে জাপানে তখন ভোর পাঁচটা বা ফাইভ এ.এম এবং তারিখ হিসেবে ধরে নেই ১০ তারিখ।

এখন জাপান থেকে যত পশ্চিমে যাওয়া হবে, সময় ততই পেছনে থাকবে। সেই হিসেবে, জাপান থেকে ৯০ ডিগ্রি দ্রাঘিমা পিছিয়ে গেলে, অর্থাৎ বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে তখন বাজবে রাত এগারোটা। তবে এইক্ষেত্রে কিন্তু তারিখ হবে ৯ তারিখ। কারণ, বাংলাদেশের সময় জাপান থেকে পিছিয়ে থাকবে।

এখন এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, ৯০ ডিগ্রি দ্রাঘিমার ব্যবধানের জন্য কেন ৬ ঘণ্টার ব্যবধান থাকবে? আসলে, প্রতি ১ ডিগ্রির দ্রাঘিমার জন্য ৪ মিনিট সময় পরিবর্তন হয়। তাহলে ৯০ ডিগ্রি ইকুয়াল টু ৩৬০ মিনিট, ইকুয়াল টু ৬ ঘণ্টা।

এবং এই জন্যই জাপানে যখন ১০ তারিখ ভোর পাঁচটা, তখন বাংলাদেশের ৯ তারিখ রাত এগারোটা। এখন এখান থেকে যদি আরো ৯০ ডিগ্রি দ্বিগুণ পিছিয়ে যাই, তবে আমরা পাবো প্রাইম মেরিডিয়ান, যেখানে সময় জাপান থেকে ৭২০ মিনিট বা ১২ ঘণ্টা পিছিয়ে থাকবে, অর্থাৎ ৯ তারিখ সন্ধ্যা পাঁচটা।

এবার সেখান থেকে যদি আরো ৯০ ডিগ্রির দ্রাঘিমা পিছিয়ে যাই, তবে সেখানের সময় জাপান থেকে ১৮ ঘণ্টা পিছিয়ে থাকবে, অর্থাৎ ৯ তারিখ সকাল এগারোটা। এবার আরো ৯০ ডিগ্রির দ্রাঘিমা পিছিয়ে গেলে, সেখানে সময় জাপান থেকে ২৪ ঘণ্টা পিছিয়ে থাকবে, অর্থাৎ ৯ তারিখ ভোর পাঁচটা।

তাহলে এখানে খেয়াল করুন, আমরা জাপানের ১০ তারিখ ভোর পাঁচটা থেকে পেছনে গণনা করতে করতে জাপানে এসে আবার ঠিক ভোর পাঁচটা পেয়েছি। তবে সেই ক্ষেত্রে তারিখ একদিন পিছিয়ে গিয়েছে। গণনার শুরুতে ছিল ১০ তারিখ, কিন্তু গণনার শেষে আমরা পেলাম ৯ তারিখ।

তার মানে এখানে একটি সমস্যা তৈরি হয়েছে। এক হিসেবে ১০ তারিখ, আবার সেই হিসেবেই পাচ্ছি ৯ তারিখ। এই সমস্যা সমাধানের জন্য একটি কাল্পনিক রেখা কল্পনা করা হয়। সেই রেখার যেই পাশে জাপান থাকবে, সেখানে ১০ তারিখ থাকবে এবং অপর পাশে হবে ৯ তারিখ।

এবং সেই কাল্পনিক রেখাকে বলা হয় আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা বা ইন্টারন্যাশনাল ডেট লাইন।

এই তারিখরেখা নিয়ে বেশ কিছু চমৎকার বিষয় রয়েছে। তবে তা বলার আগে টাইমজোন সম্পর্কে আরো কিছু বলে নেয়া দরকার। কিভাবে তারিখ চেঞ্জ হচ্ছে, এই বিষয়গুলো বোঝানোর জন্য আমি জাপানের সাপেক্ষে অন্য স্থানগুলোর সময় উল্লেখ করেছি।

তবে আমরা মোবাইলে টাইম ঠিক করার ক্ষেত্রে জিএমটি প্লাস সিক্স বা ৬ ঘণ্টা যোগ করে হিসাব করে থাকি। এখন কেন আমরা ৬ ঘণ্টা যোগ করি, এটা বোঝার জন্য প্রাইম মেরিডিয়ান বা জিরো ডিগ্রি দ্রাঘিমার দিকে লক্ষ্য করতে হবে। মনে করুন, প্রাইম মেরিডিয়ানের সূর্য একদম মাথার উপরে রয়েছে।

অর্থাৎ, জিরো ডিগ্রি দ্রাঘিমাতে থাকা সকল দেশে তখন সোলার টাইম হবে দুপুর বারোটা। এখন এখানে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়, তা লক্ষ্য করুন। এইখানে হচ্ছে বাংলাদেশ। তার মানে, বাংলাদেশের অবস্থান প্রাইম মেরিডিয়ান থেকে প্রায় ৯০ ডিগ্রি পড়বে।

সেই হিসেবে, প্রাইম মেরিডিয়ান থেকে বাংলাদেশের সময়ের পার্থক্য হবে ৯০ ডিগ্রি × ৪ মিনিট = ৬ ঘণ্টা। এখন কথা হচ্ছে, এই যে ৬ ঘণ্টার ব্যবধান—এই সময়টা কি এগিয়ে থাকবে না পিছিয়ে থাকবে? অর্থাৎ, বাংলাদেশে তখন ভোর ছয়টা হবে, নাকি সন্ধ্যা ছয়টা হবে?

এর উত্তর হচ্ছে সন্ধ্যা ছয়টা। কারণ, প্রাইম মেরিডিয়ানের বিবেচনায় পূর্বদিকে থাকা দেশগুলোতে সময় এগিয়ে থাকবে এবং পশ্চিম দিকে থাকা দেশগুলোর সময় পিছিয়ে থাকবে। সুতরাং, প্রাইম মেরিডিয়ানে যখন দুপুর বারোটা, বাংলাদেশে তখন ওই একই দিনের সন্ধ্যা ছয়টা।

আবার এই স্থানের সময় হবে ওই একই দিনের ভোর ছয়টা। অর্থাৎ, প্রাইম মেরিডিয়ান থেকে পূর্ব দিকে সময় নির্ণয়ের জন্য জিএমটি বা গ্রীনউইচ মিন টাইমের সাথে দ্রাঘিমা অনুযায়ী সময় যোগ করতে হয় এবং পশ্চিম দিকে বিয়োগ করতে হয়।

কোন একটি নির্দিষ্ট দ্রাঘিমা বরাবর যতগুলো দেশ বা স্থান রয়েছে, সেগুলোর সোলার টাইম সেম থাকে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের উপর দিয়ে যে দ্রাঘিমা রেখা অতিক্রম করেছে, সেই দ্রাঘিমাতে থাকা সকল স্থানের সোলার টাইম বাংলাদেশের সেম হবে।

এখন সোলার টাইম সেম হলেও, দেশগুলো তাদের সুবিধা অনুযায়ী সময় এদিক সেদিক করে হিসাব করে থাকে। সময় নির্ধারণের জন্য সম্পূর্ণ পৃথিবীকে মোট চব্বিশটি টাইমজোনে ভাগ করা হয়েছে এবং এই টাইমজোনগুলোতে পর্যায়ক্রমে ১ ঘণ্টার ব্যবধান রয়েছে।

এখানে খেয়াল করুন, বাংলাদেশের উপর দিয়ে একটি টাইমজোনের লাইন চলে গিয়েছে। তার মানে, এই অংশের টাইম হবে জিএমটি প্লাস সিক্স এবং এই অংশের হবে জিএমটি প্লাস সেভেন। তার মানে, বাংলাদেশের এই ২ অঞ্চলে ২ ধরনের টাইম থাকবে।

কিন্তু এমনটা করলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হবে। সেইসাথে রাষ্ট্রীয় কাজেও জটিলতা তৈরি হবে।

যার ফলে, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সমগ্র বাংলাদেশে একটি সময় মেইনটেইন করা হয় এবং তা হচ্ছে জিএমটি প্লাস সিক্স। ছোট দেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু বড় দেশের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হয়।

যেমন, আমেরিকার উপর চারটি টাইমজোন রয়েছে। তার মানে, আমেরিকার একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সময়ের ব্যবধান ৪ ঘণ্টাও হতে পারে। যার ফলে বড় দেশগুলো তাদের বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য বিভিন্ন সময় নির্ধারণ করে থাকে।

তবে এই ক্ষেত্রে চায়না কিছুটা ব্যতিক্রম। চায়নার উপর পাঁচটি টাইমজোন রয়েছে। কিন্তু চায়না বিভিন্ন অঞ্চলের জন্য বিভিন্ন সময় হিসেব না করে সম্পূর্ণ দেশের জন্য একটি সময় ব্যবহার করে এবং তা হচ্ছে বেইজিং টাইমজোন (জিএমটি প্লাস এইট)।

এমনটা করার ফলে চায়নাতে কিছু অদ্ভুত বিষয় দেখা যায়। যেমন, মনে করুন আপনি চায়নার বেইজিং শহরে নাইন-টু-ফাইভ জব করেন। এখন মনে করুন, আপনাকে ট্রান্সফার করে অন্যত্র পাঠানো হয়েছে। এখন বেইজিংয়ের সাথে এই স্থানের সময়ের পার্থক্য প্রায় ৩ ঘণ্টা।

অর্থাৎ, বেইজিংয়ে সকাল নয়টা মানে এখানে ভোর ছয়টা। কিন্তু এখানেও যেহেতু বেইজিংয়ের টাইম ব্যবহার করা হয়, সেহেতু এখানে সকাল ছয়টা বাজলেও এটিকে আপনার সকাল নয়টা বলে বিবেচনা করতে হবে। তার মানে, এই অঞ্চলগুলোতে যখন সূর্য উদয় হয়, তখন ঘড়িতে সকাল নয়টা কিংবা সাড়ে নয়টা বাজে।

অর্থাৎ, এই অঞ্চলের মানুষকে ভোর সকালেই অফিসে যেতে হয় এবং একেই সকাল নয়টা বলে বিবেচনা করতে হয়। টাইমজোনের কাল্পনিক রেখাগুলো একদম স্ট্রেইট হলেও, বিভিন্ন দেশ তাদের সুবিধা অনুযায়ী টাইম ব্যবহার করাতে টাইমজোনের রেখাগুলো এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এখন একটি টাইমজোনের ভেতরে থাকা সকল স্থানের সময় যে সেম হবে, তা কিন্তু নয়। কারণ, একটি টাইমজোনের ভেতরে প্রায় ১৫ ডিগ্রি দ্রাঘিমা রয়েছে। এখন আমরা জানি, প্রতি ১ ডিগ্রি দ্রাঘিমা চেঞ্জ হবার ফলে প্রায় ৪ মিনিটের এদিক-সেদিক হয়।

এখন আমরা যদি এতটা সূক্ষ্মভাবে হিসাব করি, সেক্ষেত্রে দেখা যাবে একটি জেলা থেকে অন্য জেলাতে গেলেই টাইমের এদিক সেদিক হচ্ছে, যদিও তা কয়েক মিনিট। এই যে একটি জেলা থেকে অন্য জেলার মধ্যে যে সময়ের পার্থক্য রয়েছে—এই বিষয়টি আমরা রমজান মাসের ইফতারের সময় বুঝতে পারি।

ইফতারের সময় নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সূক্ষ্মভাবে সোলার টাইম হিসেব করা হয় বলে বাংলাদেশের সকল স্থানে একই সময়ে ইফতার করার সুযোগ থাকে না; বরং কয়েক মিনিট এদিক সেদিক হয়ে থাকে।

এবার ইন্টারন্যাশনাল ডেট লাইন বা আন্তর্জাতিক তারিখরেখা নিয়ে কিছু মজার বিষয় উল্লেখ করা যাক। গোলাকৃতি আন্তর্জাতিক তারিখরেখা স্ট্রেইট হলেও বিভিন্ন দেশের ইচ্ছার কারণে তারিখরেখা স্ট্রেইট না থেকে এমন শেইপ ধারণ করেছে।

তারিখরেখার আশেপাশে থাকা দেশগুলো কোন অংশে থাকতে চায়, তা ওই দেশের উপর নির্ভর করে। ফলে তারিখরেখা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুইটি দ্বীপ মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যাদের নাম ডায়ামিড আইল্যান্ড। এই দুইটি দ্বীপের একটি হচ্ছে বিগ ডায়ামিড এবং অন্যটি হচ্ছে লিটল ডায়ামিড। এই দুইটি দ্বীপের মধ্যে বিগ ডায়ামিড রাশিয়ার অংশ এবং লিটল ডায়ামিড আমেরিকার অংশ।

এখন এই দুটি দ্বীপের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক তারিখরেখা অতিক্রম করেছে। যার ফলে, এই দুইটি দ্বীপের মধ্যে ২৪ ঘন্টার পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ, দুইটি দ্বীপের সময় এক হলেও তাদের তারিখ ভিন্ন। বিগ ডায়ামিডে ১১ তারিখ বিকেল তিনটা বাজলে, লিটল ডায়ামিডেও বিকেল তিনটা বাজবে, তবে সেটার তারিখ হবে ১০ তারিখ।

তার মানে, আপনার জন্মদিন যদি ২৫ তারিখ হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে বিগ ডায়ামিডে জন্মদিন পালন করে আপনি যদি লিটল ডায়ামিডে চলে যান, তবে আবার আপনার জন্মদিন পালন করতে পারবেন। এবার এই অংশে লক্ষ্য করুন—এই স্থানটি যদি আপনি ১৫ তারিখে প্লেনে করে অতিক্রম করার চেষ্টা করেন, তবে এই স্থানে আসার পরেই কিন্তু আপনি ১৬ তারিখে চলে আসবেন।

আবার এই রেখা অতিক্রম করে এখানে আসা মানেই ১৫ তারিখ। একটি বস্তু কোনো প্রকার অ্যাক্সিডেন্ট বা এনার্জি ছাড়া আজীবন সক্রিয় থাকতে পারার বিষয়টিকে বলা হয় পার্পিচুয়াল মোশন। এই পার্পিচুয়াল মোশন থেকে ফ্রি এনার্জি পাওয়া যেতে পারে—এমন ধারণা অনেকের মধ্যেই রয়েছে।

যার ফলে মানুষের আজন্ম সাধনা পার্পিচুয়াল মোশন অর্জন করা। আপারচুয়াল মোশন এবং ফ্রি এনার্জি সম্পর্কে জানতে এই ভিডিওটি দেখতে পারেন। ভিডিও ভালো লাগলে বিজ্ঞান পাগল পরিবারে যুক্ত হয়ে সাথে থাকতে পারেন।

Share: 

No comments yet! You be the first to comment.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জনপ্রিয় ক্যাটাগরি